Friday, March 17, 2023

ইআ-১ঃ ইসলামী/মুসলিম আইন, উৎস, মতবাদ, উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, সুন্নাহ/ হাদিস

১.১. ইসলামী আইন কাকে বলে? 

১.২. ইসলামী আইন বিজ্ঞানে আইনের ধারণা কি? / ইসলামী আইনের প্রকৃতি আলোচনা কর। 

১.৩. ইসলামী আইনের বৈশিষ্ট্য / উদ্দেশ্য কি কি?? 

১.৪. ইসলামি আইনের বিভিন্ন স্তর আলোচনা কর।

১.৫ ইসলামী আইন ঐশ্বরিক উৎস হতে সৃষ্টি' - এই উক্তিটির মূল্যায়ন / আলোচনা কর।

১.৬ মুসলিম আইনের বিষয়বস্তু বহুলাংশে প্রাক ইসলামী আরবিয় ও প্রথা ও রীতি নীতির উপর নির্ভরশীল ব্যাখ্যা কর। / প্রাক ইসলামী প্রথা কিভাবে ইসলামী আইনকে প্রভাবিত করেছিলো ? / প্রাক ইসলামী প্রথাসমূহ ইসলামী আইনের ক্ষেত্রে কি প্রভাব রেখেছে? / প্রাক ইসলামী যুগের প্রথা ইসলামিক আইনের কোন কোন ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়েছে? ইসলামীক আইনের সারমর্ম মূলতঃ প্রাক-ইসলামী যুগের রীতি-নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত" - আলোচনা করো। 

১.৭ মুসলিম জুরিসপ্রুডেন্স এর চারটি সুন্নি মতবাদের প্রত্যেকটির বৈশিষ্ট্য উল্লেখপূর্বক উৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশ সম্পর্কে বর্ণনা দাও। মুসলিম আইনের মতবাদ, উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, আদর্শ প্রতিষ্ঠা, কারণ সহ উল্লেখ কর।  

১.৮. ইমাম আবু হানিফাকে ব্যক্তিগত বিচারের প্রধান প্রবক্তা বলা হয় কেন?  / মুসলিম আইন বিজ্ঞানের 'আদর্শ' ও মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছে আবু হানিফা- তুমি কি এই কথা স্বীকার করো? কারণসহ আলোচনা কর। 

১.৯. কেন বলা হয়ে থাকে যে, মানব রচিত আইন হতে ইসলামী আইন সম্পূর্ণ আলাদা? / প্রচলিত মানব রচিত আইন এবং ইসলামী আইনের মধ্যে পার্থক্য সমূহ আলোচনা কর। 

১.১০ কোন অবস্থায় একজন মুজতাহিদ আইন প্রণয়নের ভূমিকা রাখতে পারে?

১.১১. সুন্নাহ/ হাদিস কাকে বলে?  সুন্নাহ/হাদিসের শ্রেনী বিভাগ কর।
১.১২ ইসলামের ভিত্তি হিসেবে হাদিসের গুরুত্ব আলোচনা কর। / হাদিসকে কেনো ইসলামী আইনের অন্যতম ভিত্তি হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

১.৭  ইসলামি আইনের বিভিন্ন উৎসের গুরুত্ব বর্ণনা কর ‌/ মুসলিম আইনের বিভিন্ন উৎস গুলো কি কি? তোমার মতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস কোনটি? তা যুক্তিসহকারে বুঝিয়ে দাও। / ইসলামী আইনের আনুষ্ঠানিক ও বস্তুগত উৎসগুলির প্রকৃতি গুরুত্ব ও ভূমিকা আলোচনা কর। চারটি আনুষ্ঠানিক উৎসের অতিরিক্ত আরো কতগুলো উৎস আছে সেগুলো কি আইনের বস্তুগত উৎস বলা যেতে পারে এবং এগুলো উপেক্ষা করা যায় না। প্রচলিত প্রথা বা উরফ বলতে কি বুঝ?


১.৭.১ ইজমা ও কিয়াসের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে উভয়টির শর্ত আলোচনা কর।




১.১. ইসলামী আইন কাকে বলে? 

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবের সমাজ ব্যবস্থা প্রথার উপর নির্ভরশীল ছিল। বিশ্বনবী মোঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর উপর পবিত্র কোরআন নাজিলের মাধ্যমে এই সকল প্রথার অনেকাংশ বিলুপ্ত হয়। শুরু হয় নতুন যুগের। মহান আল্লাহর বাণী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম হাদীস ইসলামী আইনের মূল উৎস। রাসুল সালাম পরবর্তী সময়ে কোরআন ও হাদিসের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ইজমার কেয়ার সৃষ্টি এগুলো ইসলামী আইনের উৎস। 

মুসলিম আইন: 

একজন মুসলিমের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবনসহ যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে যে বিধান রয়েছে তাকে ইসলামিক আইন বলে। মহান আল্লাহ তায়ালার বিধান ও তাঁর রাসূলের হাদিসই মূলত ইসলামী আইন। এছাড়া ইজমা ইয়াসের বিধানও ইসলামী আইনের অন্তর্ভুক্ত। 


১.২. ইসলামী আইন বিজ্ঞানে আইনের ধারণা কি? / ইসলামী আইনের প্রকৃতি আলোচনা কর। 


ইসলামী আইনের প্রকৃতি ও ধারণা:

ইসলামী আইনে একদিকে ঐশী আইন অন্যদিকে মানব সৃষ্ট আইন। অর্থাৎ ইসলামিয়া আইন ঐশী ও মানব সৃষ্ট আইনের সমন্বিত একটি আইন। এই আইনে একদিকে রয়েছে মহান আল্লাহর প্রেরিত বাণী বা পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কুরআন এর হাজার হাজার আয়াত, অন্যদিকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ  (সা.) এর কথা, কাজ ও সম্মতি সূচক হাদিস।

মহান আল্লাহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়ে কুরআন নাযিল করেছেন। আর মোহাম্মাদুর রাসূল (সা.) সেই বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেছেন এবং কোরআনের বিভিন্ন বিষয় ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন যা ইসলামী আইন হিসেবে পরিগণিত। মোহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মৃত্যুর পর তার সাহাবী ও তাবেয়ীগণ কোরআন হাদিস ছাড়াও ইজমার মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করতেন।

এগুলো ইসলামী আইন হিসেবে পরিগণিত। অতঃপর ফকীহগণ ইয়াসের মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতেন। এগুলো ইসলামী আইন হিসেবে পরিগণিত। ইসলামি আইন মানুষদের সকল দিক আলোচনা করে।


১.৩. ইসলামী আইনের বৈশিষ্ট্য / উদ্দেশ্য কি কি?? 


ইসলামী আইনের উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য:

নিম্নে ইসলামী আইনের উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো:
১) শান্তি প্রতিষ্ঠাঃ
 ইসলাম শব্দের অর্থ হচ্ছে শান্তি। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ব্যক্তি জীবনের সমাজ জীবনে রাষ্ট্র জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা ইসলামী আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য। ইসলামী আইন শুধু ইহজ জীবনের জন্য নয় পরকালের জন্য প্রতিটি মানুষ মুক্তি লাভ করে জান্নাত লাভের মাধ্যমে অনাবিল শান্তি লাভ করতে পারে সেই বিষয়েও বিধান দিয়েছে।

২) অন্যান্য আইন থেকে আলাদা: 
ইসলামী আইন মানুষের দুই জীবনের জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ জীবিত অবস্থায় মানুষ জীবন ব্যবস্থা কিভাবে পরিচালিত হবে যেমন এই আইনে উল্লেখিত হয়েছে, একজন মানুষ মৃত্যুবরণ করার পর তার কি হবে তাও ইসলামী আইনে লিপিবদ্ধ রয়েছে। যার ফলে এই আইন দেশের প্রচলিত অন্য আইন থেকে পৃথক।

৩) অন্য ধর্মের প্রতি সহানুভূতিঃ
ইসলামী আইন শুধু মুসলিম বা ইসলাম ধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়, অন্যান্য ধর্মের প্রতিও সহানুভূতিশীল। কারণ ইসলামী আইনে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সহ অবস্থানকে সমর্থন করে। ইসলাম অন্য ধর্মের অনুসারীদের উপর বিধান চাপিয়ে দেয় না। সকলে তার ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালন করবে এটি ইসলামী আইনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ ইসলাম অন্য ধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল।

৪) মুসলিমদের ইসলামী আইন পালনে বাধ্য করা: 
ইসলামী আইন অন্য ধর্মের অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণ না করলেও মুসলমানদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই আইন পরকালীন জীবন কঠিন শাস্তির স্মরণ করিয়ে অন্যায় কাজ থেকে মুসলমানদেরকে দূরে রাখে। অর্থাৎ মুসলিম বোন পরকালীন শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে এই আইন পালনে বাধ্য হয়।

৫) আদর্শ প্রতিষ্ঠাঃ 
ইসলামী আইনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহর বিধান ও রসূলের (সা.) নির্দিষ্ট পথ সমাজে প্রতিষ্ঠা করা ইসলামী আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) বিধান সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ইহকালে যেমন শান্তি হবে তেমনি পরকালেও শান্তি লাভ করা যাবে।

৬) পরকালের প্রতি বিশ্বাস: 
ইসলামী আইনের মূল উদ্দেশ্য ইহকাল নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন মানুষ এবং জিনকে তিনি তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ মানুষ প্রার্থীর জীবনের সকল কাজ তার নির্দেশিত বিধান অনুযায়ী সম্পন্ন করবে এবং পরকালের মুক্তি লাভ করবে এটাই ইসলামী আইনের উদ্দেশ্য।


১.৪. ইসলামি আইনের বিভিন্ন স্তর আলোচনা কর।


ইসলামী আইন পর্যালোচনা করলে এর বিভিন্ন স্তর লক্ষ্য করা যায়। ইসলামী আইনের বিভিন্ন স্তর উল্লেখ করা হলো: 

১) প্রাথমিক স্তর: 
আল কুরআন এবং আল হাদিসকে ইসলামী আইনের প্রাথমিক স্তর গণ্য করা যায়। কিগো ২৩ বছর ধরে মহান আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে রাসূলের (সা.) নিকট বাণী পাঠিয়েছেন। এই বাণী রাসূল (সা.) সাহাবীদের নিকট বর্ণনা করতেন এবং তা লিপিবদ্ধ করা হতো। পবিত্র আল কুরআন একটি পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। মানুষের জীবনের যাবতীয় বিষয় এই কোরআনের উপবদ্ধ হয়েছে। 

রাসূল সাল্লাল্লাহু ইসলামের কথা, কাজ বা সম্মতি হল হাদিস। হাদিসও ইসলামী আইনের প্রাথমিক স্তরে লিখিত হয়। গুরুত্ব দিক দিয়ে আল কুরআনের পরে হাদিসের স্থান। আল্লাহ প্রদত্ত কুরআনের বাণী রাসূল (সা.) বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। সুতরাং আল কুরআনের পাশাপাশি রাসূলের (সা.) জীবদ্দশায় তার নিজের এবং সেই সময়ের সাহাবীদের বিভিন্ন পর্যালোচনা কে ইসলামী আইনের প্রাথমিক স্তর গণ্য করা যায়।


২) দ্বিতীয় স্তর:
রাসূল সাল্লাল্লাহু সালামের ইন্তেকালের পর যে সকল মনীষী সাহাবীদের স্পর্শে এসেছেন তাদের সময়কে ইসলামী আইনের দ্বিতীয় স্তর বলা যায়। যারা রাসূলের (সা.) সংস্পর্শে আসতে পারেননি কিন্তু সাহাবীদের সংস্পর্শে এসেছেন তাদেরকে তাবিয়ী বলা হয়।

এই সকল তাবিয়ীদের উদ্ধৃতি, ব্যাখ্যা বা মতামত হল দ্বিতীয় স্তরের আইন। ইসলামী আইনের দ্বিতীয় যুগে ব্যাপকভাবে ইজমার প্রচলন হয়।

উল্লেখযোগ্য কয়েকজন তাবিয়ী হলেন, ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.), হাসান আল বাসির  (রহ.), সালিম ইবনে আব্দুল্লাহ  (রহ.), কাজী সুরায়হা  (রহ.), আলকামা ইবনে কায়েস (রহ.), আবু বকর ইবনে আব্দুর রহমান (রহ.), ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইত্যাদি।


১) তৃতীয় স্তর: 
যে সকল মনিষীগণ সাহাবীদের যুগের পর জন্মগ্রহণ করেছেন অর্থাৎ সাহাবীদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পাননি কিন্তু তাবিয়ীদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়েছে তাদের কে তাবি-তাবিয়ী বলা হয়। তাবি- তাবিয়ীদের যুগকে ইসলামী আইনে তৃতীয় যুগ হিসেবে গণ্য করা যায়। তৃতীয় যুগে ইতিহাসের প্রচলন শুরু হয়। এ যুগে মনীষীদের বিভিন্ন বর্ণনা অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় যুগের মনীষীদের বর্ণনা থেকেও শক্তিশালী গণ্য করা হয়। বর্তমান বিশ্বের প্রচলিত চারটি মাযহাব সৃষ্টি হয় মূলত তৃতীয় শতাব্দী অর্থাৎ তৃতীয় স্তরের মধ্যে।


৪) শেষ স্তর: 
ইসলামিয়া আইনের তৃতীয় স্তরের পর থেকে অর্থাৎ তৃতীয় শতাব্দীর পর থেকে আজ পর্যন্ত সময়কে ইসলামী আইনের শেষ স্তর বলা যায়। বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত চারটি মাযহাব সৃষ্টি পর থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় হলো ইসলামী স্তরের শেষ স্তর।



১.৫ ইসলামী আইন ঐশ্বরিক উৎস হতে সৃষ্টি' - এই উক্তিটির মূল্যায়ন / আলোচনা কর।


ইসলাম আবির্ভাব এর পূর্বে আরব সমাজ ব্যবস্থার প্রথা এর উপর নির্ভরশীল ছিল। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর উপর পবিত্র কোরআন নাজিলের মাধ্যমে এই সকল প্রথার অনেকাংশ বিলুপ্ত হয়। শুরু হয় নতুন যুগের। মহান আল্লাহর বাণী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম হাদিস ইসলামী আইনের মূল উৎস। রাসূল সাঃ পরবর্তী সময়ে কোরআন ও হাদিসের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ইজমা কিয়া সৃষ্টি হয়। এগুলি ইসলামী আইনের উৎস। 


ইসলামী আইন ঐশ্বরিক আইন হতে সৃষ্টি আলোচনা: 
মহান আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর বিদায় হলো ইসলামের মূল আইন। একজন মুসলিমের ব্যক্তিজীবন সমাজ জীবন রাষ্ট্র জীবনসহ যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে যে বিধান রয়েছে তাকে ইসলামী আইন বলে। ইসলামী আইন একটি ঐশী আইন।  তবে সম্পূর্ণভাবে ঐশী আইন নয়। কারণ ইসলামী আইনের মধ্যে মহান আল্লাহর বিধান রয়েছে, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর হাদিস রয়েছে, বিভিন্ন মুজদাহিদগণের অভিমত ইত্যাদি রয়েছে। অর্থাৎ ইসলামি আইন ঐশী এবং মানব রচিত আইনের সমন্বিত একটি আইন।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইসলামী আইনের অনেক বিধান দিয়েছেন। কোরআনে অনেক বিধান আছে যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। সেই সকল বিষয় মোহাম্মদ সাঃ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বা কাজের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন নতুন বিষয় মানুষের সামনে উপস্থিত হচ্ছে। এই সকল বিষয়ের অনেক কিছু কোরআন বা হাদিসে উল্লেখ নেই। সেই সকল বিষয় ইসলামী চিন্তাবিদগণ বা মুজাহিদগণ কুরআন হাদিসের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্লেষণ করে থাকেন বা সিদ্ধান্ত প্রদান করে থাকেন। 

তবে ইসলামী আইন ঐশ্বরিক আইন হতে সৃষ্টি একথা বলা যায়। কারণ আল-কোরআন হল ইসলামী আইনের প্রধান উৎস। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে মহান আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে রাসুলের নিকট বাণী পাঠিয়েছেন। এই বাড়ি রাসূল সাহাবীদের নিকট বর্ণনা করতেন এবং তা লিপিবদ্ধ করা হতো। পবিত্র আল কুরআন একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। মানুষের জীবনের যাবতীয় বিষয় এই কোরআনে লিপিবদ্ধ হয়েছে। 
সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় ' ইসলামি আইন ঐশ্বরিক আইন হতে সৃষ্ট' আইন।


১.৬ মুসলিম আইনের বিষয়বস্তু বহুলাংশে প্রাক ইসলামী আরবিয় ও প্রথা ও রীতি নীতির উপর নির্ভরশীল ব্যাখ্যা কর। / প্রাক ইসলামী প্রথা কিভাবে ইসলামী আইনকে প্রভাবিত করেছিলো ? / প্রাক ইসলামী প্রথাসমূহ ইসলামী আইনের ক্ষেত্রে কি প্রভাব রেখেছে? / প্রাক ইসলামী যুগের প্রথা ইসলামিক আইনের কোন কোন ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়েছে? ইসলামীক আইনের সারমর্ম মূলতঃ প্রাক-ইসলামী যুগের রীতি-নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত" - আলোচনা করো। 

পবিত্র কুরআন হল ইসলামী আইনের মূল ভিত্তি। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখের কথা কাজ বা কোন কাজের সমর্থন হল ইসলামী আইনের দ্বিতীয় ভিত্তি। মুহাম্মাদুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর পবিত্র কোরআন নাজিল হয়। এই কুরআন বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর সময়ের পূর্বে আরব সমাজ ছিল সম্পূর্ণরূপে প্রথার উপর নির্ভরশীল। ইসলামী আইনে সেই সকল প্রথা বা রীতিনীতি সকল কিছু বাদ দেওয়া হয়নি। উক্ত প্রধান অনেকাংশ গ্রহণ বর্জন বা সংশোধন করা ইত্যাদির মাধ্যমে ইসলামী যুগের সূচনা হয়। নিম্নে প্রাক ইসলামী যুগের প্রথার গ্রহণ বর্জন সংশোধন ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো: 

১) বিবাহের ক্ষেত্রে: প্রাক ইসলামী যুগের সাধারণত চার ধরনের বিবাহ প্রচলিত ছিল। তারমধ্যে একপ্রকার ছিল- কোন ব্যক্তি অন্য কোন ব্যক্তিকে তার কন্যা বা পোষ্যকে বিবাহের প্রস্তাব প্রদান করত। এর বিনিময় কিছু মোহরও ও ধার্য করা হতো। এই ধরনের নিয়ম ইসলামী আইনেও বলবৎ রয়েছে। অন্য তিন প্রকার বিবাহের রীতি ইসলাম প্রত্যাখ্যান করেছে। 

২) একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে: প্রাক ইসলামী যুগে আরবে বহু বিবাহ প্রচলিত ছিল। ইসলামী আইনে এই প্রথার অনুসরণ করে একজন পুরুষের সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী রাখার বিধান রাখা হয়। অর্থাৎ একাধিক বিবাহ মূলত: প্রাক ইসলামিক যুগের একটি প্রথা।

৩) তালাকের ক্ষেত্রে: প্রাক ইসলামী যুগে শুধু পুরুষরাই তালাক প্রদান করতে পারতো। নারীদের তালাক প্রদানের কোন অধিকার ছিল না। ইসলামী যুগে নারীদের তালাক প্রদানের অধিকার দেয়া হয় কিন্তু সেক্ষেত্রে পুরুষ কর্তৃক নারীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করতে হয়। এটিও মূলত: প্রাক ইসলামী যুগের প্রভাব।


৪) দানের ক্ষেত্রে: প্রাক ইসলামিক যুগে ধানের ক্ষেত্রে কোন সীমারেখা ছিল না। ইসলামী আইনে ও ধানের ক্ষেত্রে কোন সীমারেখা নেই। তবে ইসলামী আইনে উইল এর ক্ষেত্রে কিছু সীমারেখা রয়েছে।

৬) মোহরের ক্ষেত্রে: প্রাক ইসলামী যুগে স্ত্রীদের জন্য মোহর ব্যবস্থা ছিল। তবে সেই মোহর স্ত্রীরা গ্রহণ করত না। বরং তার পিতা বা অভিভাবক গ্রহণ করতেন। ইসলামী আইনে বিবাহের অন্যতম শর্ত হলো মোহর ধার্য করা। তবে এই মোহর স্ত্রীর নিজের জন্যই নির্ধারিত হয় তারাই এটা গ্রহণ করে। 

৬) উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে: প্রাক ইসলামিক যুগে নারীরা সাধারণত উত্তরাধিকারের থেকে বঞ্চিত হতো। তবে রক্তের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়া হতো। ইসলামী আইন ও রক্তের সম্পর্ককে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়।



১.৭ মুসলিম জুরিসপ্রুডেন্স এর চারটি সুন্নি মতবাদের প্রত্যেকটির বৈশিষ্ট্য উল্লেখপূর্বক উৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশ সম্পর্কে বর্ণনা দাও।মুসলিম আইনের মতবাদ, উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, আদর্শ প্রতিষ্ঠা, কারণ সহ উল্লেখ কর।  

পৃথিবীতে অধিকাংশ বিষয় নিয়েই বিভিন্ন বিজ্ঞানী বা মনীষীদের বিভিন্ন মত রয়েছে। ইসলামিয়া আইনীয় বিভিন্ন মুজতাহিদের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর মৃত্যুর পর বিভিন্ন সময়ে এই মতবাদ বা মাযহাব গুলি উৎপত্তি হয়েছে। বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম মূলত চারটি মাযহাবের অনুসারী।

মুসলিম আইনে বিভিন্ন মতবাদের উৎপত্তি ও বিকাশ/ ইসলামিক জুরি স্টুডেন্টস এর চারটি সুন্নি মতবাদের বৈশিষ্ট্য উৎপত্তি ও বিকাশ: 

৪০ হিজরী থেকে তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন মতবাদ বা মাযহাব উৎপত্তি হয়। নিম্নে বিভিন্ন মাযহাব উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো: 

১) হানাফী মাযহাব:
হানাফী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফা (রহ.)।
তিনি হিজরী ৮০ সনে ইরাকে জন্মগ্রহণ করেন।
জ্ঞান বুদ্ধি পাণ্ডিত্য ইত্যাদি বিষয়ে তিনি তৎকালীন সময়ে সর্বজন সমাদৃত ব্যক্তি ছিলেন।

শুধু তৎকালীন সময় নয়, বর্তমান ও পৃথিবীর মুসলমানদের বৃহৎ অংশ তার প্রচলিত মাযহাব অনুসরণ করেন। 

প্রথম জীবনে তিনি ধর্ম ও দর্শনশাস্ত্র অধ্যায়নের পর ব্যবহার শাস্ত্র অধ্যায়ন করেন। তৎকালীন প্রখ্যাত আইনবিদ জাফর আজ সাদেক এবং অধ্যাপক হামদ ছিলেন আবু হানিফা র শিক্ষাগুরু।

ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহ আলাইহি বিদ্যা বুদ্ধিতে এতই পারদর্শী ছিলেন যে, অত্যন্ত জটিল বিষয়ক তিনি অতি সহজে নির্ভুলভাবে সমাধান করতে পারতেন।

ইমাম আবু হানিফা একদিকে ছিলেন আইন শাস্ত্রের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা। অন্যদিকে তার কল্যাণেই কিয়াসের সূত্রপাত হয়। আবার ইমাম আবু হানিফা ইজতিহাদ নীতির প্রবর্তন করেন।

ইমাম আবু হানিফা আইনতত্ত্ব প্রণয়নের জন্য ৪০ জন ব্যক্তি নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটিতে বিভিন্ন ধরনের লোক ছিলেন। ‌ যেমন প্রখ্যাত হাদিস বেত্তা, আরবি ভাষার পন্ডিত, যুক্তিবাদী ইত্যাদি। এই কমিটি দীর্ঘদিন আইন বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন। তখন প্রতিটি আইনের জন্য জনমত যাচাই করা হতো। কুফার শাসনকর্তা ইমাম আবু হানিফা কে কাজির পথে অধিষ্ট করেন। কিন্তু তিনি উক্ত পথ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। ‌পরিণতিতে কুফার শাসনকর্তা আবু হানিফাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন ‌। এক পর্যায়ে কারাগারে তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। 150 হিজরীতে আবু হানিফা প্রায় 70 বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

২) মালিকি মাযহাব: 
মানে কি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালিক (রহ)।
ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহ আলাইহি ছিলেন ইমাম আবু হানিফার সমসাময়িক লোক।
ইমাম মালিক রহমতুল্লাহ আলাইহির জন্মস্থান ছিল মদিনা। তখন মদিনা ছিল ইসলামিক জ্ঞান চর্চার সর্বশ্রেষ্ঠ কেন্দ্র। ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহ আলাইহি মদিনাতে সর্বশ্রেষ্ঠ হাদীস বেত্তা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। ইমাম মালিকের নাম অনুসারে তার প্রতিষ্ঠিত মাজহাবের নাম মালিকি মাযহাব। উত্তর আফ্রিকার বহু আদিবাসী মালিকি মাযহাবের অনুসারী।
হাদিস অধ্যয়নে ইমাম ইমাম মালিক ইমাম হানিফার চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা লাভ করেন। ইমাম মালিক হাদিসের উপর গুরুত্ব দিতেন আর ইমাম আবু হানিফা বিচার বিবেচনার উপর জোর দিতেন। ইমাম মালিক 'ইসতিদলাল' প্রবর্তন করেন। ইমাম মালিক সংকলিত অন্যতম হাদীস গ্রন্থের নাম 'আল মুয়াত্তা'।
ইমাম আবু হানিফার মৃত্যুর ২৯ বছর পর হিজরী 179 সনে ইমাম মালিক ইহকাল ত্যাগ করেন।


৩) শাফিয়ী মাযহাব: 
শফি ই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম শাফিয়ী। ইমাম শাফিয়ী কুরাইশ বংশের হাশিমি গোত্রের লোক ছিলেন। তার জন্মস্থান ফিলিস্তিন। ইমাম শাফিয়ী ইমাম আবু হানিফার নিকট আইনশাস্ত্র অধ্যায়ন করেন। তিনি অসাধারণ বাগ্নিতাশক্তিরও অধিকারী ছিলেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই ইমাম শাফিয়ী প্রবর্তিত মাযহাব জনপ্রিয়তা লাভ করে। যুক্তি এবং তর্ক এই দুটির সামঞ্জস্য বিধান করে আইন প্রণয়ন করা ছিল শাফিয়ী মাযহাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

ইমাম শাফি ইমাম আবু হানিফা প্রবর্তিত 'ন্যায়পরায়ননীতির' উপর গুরুত্ব আরোপ করতেন না। তিনি ইজমার উপর গুরুত্ব আরোপ করতেন।

উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা, ভারতের মাদ্রাজ, বোম্বাই ইত্যাদি স্থানের শাফিয়ী মাযহাবের অনুসারী বেশি।

৪) হাম্বলি মাযহাব: 

হাম্বলী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ )।
ইমাম আহমদ হাম্বল 164 হিজরীতে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন।

হাদিস আছে তার ছিল অসামান্য পাণ্ডিত্য। তিনি ছিলেন তার মতবাদের উপর অবিচল। যার ফলে তিনি বাগদাদের খলিফার কোপদৃষ্টি পরে নানাভাবে নির্যাতিত হন।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল হাদীস ভক্ত লোক হওয়ার কারণে প্রায় পঞ্চাশ হাজার হাদিস সংকলন করেন। তার সংকলিত হাদিস গ্রন্থের নাম 'মসনদুল ইমাম হাম্বল'।

সৌদি আরবের লোকই ইমাম আহমদ বিন হাম্বল মাযহাবের অনুসারী। 

হিজরী ২৪১ সনে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ইহকাল ত্যাগ করেন। 




১.৮. ইমাম আবু হানিফাকে ব্যক্তিগত বিচারের প্রধান প্রবক্তা বলা হয় কেন?  / মুসলিম আইন বিজ্ঞানের 'আদর্শ' ও মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছে আবু হানিফা- তুমি কি এই কথা স্বীকার করো? কারণসহ আলোচনা কর। 

ইসলামী আইন বিজ্ঞানের বিকাশকে তোর নিতো করার জন্য ইমাম আবু হানিফা হাদিস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একটি কমিটি গঠন করেন। এবং মসনদ কুল ইমাম আবু হানিফা নামক একখানি হাদিস গ্রন্থ সংকলন করেন।

সর্বোপরি, আইনের বিচারনীতি হিসেবে তিনি ইসতিহসান এর প্রবর্তন করেন। ইহার আক্ষরিক অর্থ অগ্রাধিকার প্রদান। ইহা বহুলাংশে ইংরেজি ইকুইটি আইনের অনুরূপ।

ইমাম আবু হানিফা ছিলেন কিয়াস পদ্ধতির মহান অনুসারী। আবরোহনমূলক পদ্ধতিতে কোন প্রতিষ্ঠিত সূত্র থেকে যুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কে কিয়াস বলা হয়। এই কিয়াসই হানাফী আইনে অধিকতর ব্যবহৃত হয়েছে।

একথা স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, ইমাম আবু হানিফা প্রকৃতপক্ষে সুন্নাহ ও হাদিসের চাইতে নিজের মুক্ত বুদ্ধির উপর অধিকতর নির্ভরশীল ছিলেন। যে ক্ষেত্রে কোরআন হাদিস বা ইজমাতে কোন প্রকার আইনের ব্যাখ্যা পাওয়া যেত না সে সকল ক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তিগত বিচার বুদ্ধির মাধ্যমে সিদ্ধান্তগ্রহণে তৎপর হতেন।

এজন্যই তাকে ইসলামী আইনের জগতে ব্যক্তিগত রায়ের সমর্থক বলে অবহিত করা হয়। তাই তার সমসাময়িক পন্ডিতগণ মনে করতেন যে, তিনি যুক্তিভিত্তিক নীতির উপর সর্বদাই বেশি জোর দিতেন হাদিসের উপর নয়, আমার মতে এভাবে হানাফি মতবাদ ইসলামী আইন বিজ্ঞান বিকাশে অবদান রেখেছিল তাই ইমাম আবু হানাফিকে ইসলামী আইন বিজ্ঞানের আদর্শ মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।




১.৯. কেন বলা হয়ে থাকে যে, মানব রচিত আইন হতে ইসলামী আইন সম্পূর্ণ আলাদা? / প্রচলিত মানব রচিত আইন এবং ইসলামী আইনের মধ্যে পার্থক্য সমূহ আলোচনা কর। 


আধুনিক আইন-বিজ্ঞান ও ইসলামী আইন বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য: 

নিমনি আধুনিক আইন বিজ্ঞান ও ইসলামী আইন-বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করা হলো: 
১) সৃষ্ট গত পার্থক্য: ইসলামী আইন ঐশ্বরিক আইন। পক্ষান্তরে আধুনিক আইনবিজ্ঞান মানুষের তৈরি। 
২) প্রতিশব্দগত: ইসলামী আইন বিজ্ঞান কে ইংরেজিতে Islamic Jurisprudence বলে। অপরদিকে আধুনিক আইনবিজ্ঞানকে ইংরেজিতে Modern Jurisprudence বলে। ‌

৩) মতবাদ গত পার্থক্য: ইসলামী আইনে আল্লাহর নির্দেশ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর উপদেশ রয়েছে। পক্ষান্তরে আধুনিক আইন বিজ্ঞানে বিভিন্ন ব্যক্তির মতবাদ রয়েছে।

৪) নৈতিকতা গত: ইসলামী আইনে নৈতিক বিধান ও আইনগত বিধানের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। পক্ষান্তরে আধুনিক আইন বিজ্ঞানে নৈতিক বিধান ও আইনগত বিধানের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

৫) লক্ষ্য গত পার্থক্য: ইসলামী আইনের লক্ষ্য হলো মানুষের ইহকাল পরকাল উভয়কালের মুক্তি। পক্ষান্তরে আধুনিক আইনবিজ্ঞান শুধু ইহকালের সাথে সম্পৃক্ত।

৬) সীমাবদ্ধতা গত: ইসলামী আইন কোন রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পক্ষান্তরে আধুনিক আইন-বিজ্ঞান আধুনিক আইনবিজ্ঞান রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

৭) বিষয়বস্তুগত: আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও রাসূলের (সা.) বাণীকে ইসলামী আইন বলে। পক্ষান্তরে যা মানুষের আচরণ বিধি নিয়ন্ত্রণ করে তাই হল আধুনিক আইন।

৮) বাতিলগত পার্থক্য: ইসলামী আইন বাতিল বা পরিবর্তন সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে আধুনিক আইন বাতিল বা পরিবর্তন সম্ভব।

৯) শাস্তি গত: ইসলামিক আইন ভঙ্গ করলে পরকালী শাস্তির ভয় থাকে। পক্ষান্তরে আধুনিক আইন বিজ্ঞানের আইন ভঙ্গ করলে ইহকালের শাস্তির ভয় থাকে। 

আল কুরআনের প্রতিটি আইন প্রতীক মুসলিমের মেনে চলা বাধ্যতামূলক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর প্রদর্শিত রীতিনীতি ও মুসলমানদের পালন করার জরুরী। এছাড়া আল কুরআন এর ও রাসুলের হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন রীতিনীতি সম্মিলিত আইন ও মেনে চলা প্রয়োজন। 





১.১০ কোন অবস্থায় একজন মুজতাহিদ আইন প্রণয়নের ভূমিকা রাখতে পারে?

পবিত্র কুরআন ও আল হাদিসের ব্যাখ্যা প্রদান এবং বাস্তবে তার প্রয়োগের জন্য যে সকল ব্যক্তিবর্গ নিয়োজিত তাদেরকে মুজতাহিদ বলে।

মুজতাহিদের শ্রেণীবিভাগ:
মুজদাহিদের নিম্নের তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।

১) মুজতাহিদ ফিশশারা: 
যে সকল মুজতাহিদ মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেছেন তারা মুজতাহিদ ফিশশারা শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। যেমন- আবু হানিফা, ইমাম শাফিয়ী, ইমাম মালিক, ইমাম হাম্বল।

২) মুজতাহিদ ফিল মাযহাব:
যে সকল মুজতাহিদ নির্দিষ্ট মাযহাবের রীতি অনুযায়ী আইনের ব্যাখ্যা দান করেছেন এবং নির্দিষ্ট ইমামকে অনুসরণ করে চলেছেন তারা মুজতাহিদ ফিল মাযহাব শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।

৩) মুস্তাহিদ ফিল মাসাইল:
প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর মুজতাহিদ ছাড়াও অন্য মুজতাহিদগণ মুজতাহিদ ফিল  মাসাইল শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।

মুজদাহিদদের যোগ্যতা ও গুণাবলী: 

একজন ব্যক্তিকে মুজতাহিদ হতে হলে নিম্নলিখিত যোগ্যতা ও গুণাবলী থাকতে হবে: 
১) মুজতাহিদ হতে হলে তাকে সাবালক, বুদ্ধিমান, ধী-শক্তি সম্পন্ন হতে হবে।
২) পবিত্র কোরআনের আভিধানিক অর্থসহ আল কুরআনের বিভিন্ন বিভাগ সম্পর্কে তার প্রচুর জ্ঞান থাকতে হবে।
৩) আল কুরআনের শানে নুযুল জানতে হবে।
৪) পবিত্র কুরআন, আল হাদিস এবং ইসলামী অন্যান্য আইনে বিশেষ জ্ঞান থাকতে হবে।
৫) আল হাদিসের মূল পারসহ তার সনদ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে।
৬) হাদিসের প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে অর্থাৎ কোন হাদিস মজবুত এবং কোন হাদিসের দুর্বল বুঝার ক্ষমতা থাকতে হবে।
৭) কিয়াসের নীতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল থাকতে হবে।
৮) আরবি ভাষা আরবি ব্যাকরণ সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান থাকতে হবে।
৯) মানসুক আইন সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে।


 
১.১১. সুন্নাহ/ হাদিস কাকে বলে?  সুন্নাহ/হাদিসের শ্রেনী বিভাগ কর।

আল হাদিসের আভিধানিক অর্থ: হাদিস একটি আরবি শব্দ। এটি হাদাস এবং হুদস থেকে নিষ্পন্ন হয়েছে। 

হাদিস শব্দটি- কথা - বাণী ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। 
পবিত্র কুরআনে নতুন সংবাদ, নতুন কথা, ইত্যাদি অর্থ হাদিস শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। তবে আভিধানিক অর্থ- নব উদ্ভূত কোন বস্তু পূর্বে যার কোন অস্তিত্ব ছিল না। 

পারিভাষিক অর্থ: রাসূলের কথা কাজ ও সমর্থন এবং তার গুণকে হাদিস বলে। মুহাদ্দিসগণের মতে, রাসূলের জাগ্রত ও ঘুমন্ত অবস্থায় তার গতিবিধি ও হাদিসের অন্তর্ভুক্ত।

ডঃ মাহমুদ তাখনান বলেন- নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর কাজ কথা এবং মনুসংদী ও তার যাবতীয় গুণাবলী কে হাদিস বলে। ‌

সুতরাং বলা যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর কথা কাজ বা সম্মতিকে হাদিস বলে।

হাদিসের শ্রেণীবিভাগ: 

মুহাদ্দিসগণ হাদীস কে বিভিন্ন দিক দিয়ে শ্রেণীবিন্যাস করেছেন। ‌‌ রাসুল সালামে কথা কাজ সমর্থনের দিক দিয়ে হাদিসকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে । 

ক) কাওলি, খ) ফেলি, গ); তাকরীরী

উপরোক্ত তিন শ্রেণীর হাদিসকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। 
১) মারফু: যে হাদিসের বর্ণনাকারী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছেছে তাকে হাদীসে মারফু বলে।
২) মাউকুফ: যে হাদিসের বর্ণনাকারী সাহাবীর রাহমাতুল্লাহ তাকে হাদীসে মাওকূফ বলে। 
৩) মাকতু: যে হাদিসের বর্ণনাকারী তাবিই পর্যন্ত পৌঁছেছে তাকে হাদীসে মাকতু বলে।

ইমাম আহমদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি অনেক মুহাদ্দিসের মতে হাদিস প্রধানত দুই প্রকার। 

১)! মকবুল বা সহীহ হাদিস
২) মরদুদ বা য ইফ হাদিস।

মকবুল বা সহীহ হাদিস মোট চার প্রকার : 

১) সহিহ লি - যাতিহী 
২) হাসান লি যাতিহি
৩ সহীহ লি গাই রিহী
৪) হাসান লি গাই রিহি

ইমাম তিরমিজি সহ অনেক মুহাদ্দিস হাদিসকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন

১) সহীহ হাদিস
২) হাসান হাদিস
৩) যইফ হাদিস




১.১২ ইসলামের ভিত্তি হিসেবে হাদিসের গুরুত্ব আলোচনা কর। / হাদিসকে কেনো ইসলামী আইনের অন্যতম ভিত্তি হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

ইসলামী আইনের দ্বিতীয় প্রধান উৎস হল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর হাদিস ‌। পবিত্র কোরআনের পরেই এর স্থান। এটি মূলত: আল কোরআনের ব্যাখ্যা। 

পবিত্র কোরআন নাযিল হয়েছে দীর্ঘ 23 বছর ধরে। এই ২৩ বছরের নবুওয়াতি জীবনে মহানবী সাল্লাল্লাহু রিসালাতের সুমহান দায়িত্ব পালন করেন। এই ব্যক্তিত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি যা কিছু করেছেন, যা কিছু বলেছেন এবং যা কিছু সমর্থন দিয়েছেন তা নির্ভরযোগ্য রেকর্ডই হল হাদিস। 

কোরআন সমর্থন করে না হাদিসে এমন কিছু নেই বা পাওয়া যাবে না। উক্ত বিষয়গুলো হাদিসের বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। কুরআনের অনেক আয়াতের ব্যাখ্যা হাদিস দ্বারা উপস্থাপন করা হয়েছে। এই হিসেবে হাদিসকে কোরআনের ভাষ্যকার বলায় যায়।

যেকোনো ব্যক্তি ইচ্ছে করলেই কোরআনের ব্যাখ্যা করতে পারেনা। এজন্য একটি হাদিসে মহানবী সাঃ বলেছেন যে ব্যক্তি নিজ ইচ্ছামতো কোরআনের ব্যাখ্যা করে সে যেন তার বাসস্থান জাহান্নামে ঠিক করে নেয়।
কোন মুসলিম শুধু কোরআন মানবে কিন্তু হাদিস মানবে না এমনটি হবে না। কারণ একটি হাদিসে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি কোন কারণ ছাড়া হাদিস প্রাপান করলে সে কাফির বলে গণ্য হবে। 
মহানবী সাঃ তার বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা তা আঁকড়ে ধরো, তাহলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হল আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ।।

মূলত: নবীর সুন্নাহ হল হাদিস। 
পরিশেষে বলা হয় পবিত্র কুরআন এবং হাদিস একটি অন্যটির পরিপূরক । অর্থাৎ ইসলামিয়া আইনের প্রধান উৎস হল আল কুরআন এবং দ্বিতীয় উৎস হলো মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর হাদিস।




No comments:

Post a Comment