৪.১ হিন্দু কে?
৪.২ হিন্দু আইন কি? হিন্দু আইনের উৎস ও প্রকৃতি ব্যাখ্যা কর।
৪.৩ হিন্দু আইনের উৎস গুলি আলোচনা করো।
৪.৪ হিন্দু আইনের বিভিন্ন মতবাদ গুলো কি কি? দুটি মতবাদ ব্যাখ্যা কর।
৪.৫ মিতাক্ষরা এবং দায়ভাগ মতবাদের মধ্যে মৌলিক ব্যবধানগুলি আলোচনা কর।/ পার্থক্য লিখ।
৪.৬ একজন হিন্দু কিভাবে তার নিজের আইন বহন করে? উক্তিটি পর্যালোচনা কর। / অথবা যখন একটি হিন্দু এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যায় তখন সে কি তার ব্যক্তিগত আইন বহন করে? / হিন্দু আইন লেক্সনসি নয় বরং ব্যক্তিগত আইন।
৪.৭ হিন্দু আইনের নিয়ম অনুযায়ী ' প্রথার ব্যবহার রীতি সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকলে তা আইনের লিখিত ধারাকে অগ্রাহ্য করতে পারে' এই উক্তিটি একটি মুখ্য মামলার নজির উল্লেখপূর্বক বর্ণনা কর। অথবা হিন্দু আইনের সুবিদিত প্রথা শত গ্রন্থ থেকে ও শক্তিশালী আলোচনা কর।
৪.৮ বাংলাদেশের প্রচলিত হিন্দু আইনের উত্তরাধিকারের সাধারণ নীতিসমূহ আলোচনা কর।/ হিন্দু দায়ভাগ অনুসারে উত্তরাধিকার নির্ণয়ের মূলনীতি গুলো আলোচনা কর।
৪.৯ দায়ভাগ মত অনুসারে হিন্দু আইনে কারা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয় এবং কেন? / উত্তরাধিকার অর্জনে অক্ষমতার কারণ কি এবং কেন? / বাংলাদেশের হিন্দু আইনে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবার কারণগুলো বর্ণনা কর।
৪.১০ প্রণীত আইন দ্বারা এগুলোর কিরূপ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে?/ হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে কি কি পরিবর্তন আনা হয়েছে?
৪.১১ হিন্দু বিবাহ ও এর উদেশ্য।
৪.১২ বৈধ বিবাহের আবশ্যকীয় উপাদান/শর্ত গুলো কি কি লিখ।
৪.১৩ হিন্দু বিবাহের ধর্মীয় ও পার্থিব গুরুত্ব আলোচনা কর।
৪.১৪ হিন্দু বিবাহের প্রকারভেদ ।
৪.১৫ দত্তক কি? হিন্দু আইনে বৈধ দত্তকের শর্তাবলী কি?
৪.১৬ কে দত্তক গ্রহণ করতে পারে?
৪.১৭ কাকে দত্তক গ্রহণ করা যায় আলোচনা কর।
৪.১৮ বোনের ছেলেকে কি দত্তক গ্রহণ করা যায়?
৪.১৯ একমাত্র পুত্রকে দত্তক গ্রহণ করা কি বৈধ?
৪.২০ কোন হিন্দু বা বিধবা মৃত স্বামীর আগাম অনুমতি ছাড়া দত্তক গ্রহণ করতে পারে কি?
৪.২১ বাংলাদেশের কোন কায়স্থ কি নমশূদ্রকে দত্তক গ্রহণ করতে পারে?
৪.২২ হিন্দু আইনে ভরণপোষণ কাকে বলে?
৪.২৩ হিন্দু আইন অনুযায়ী কারা ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী? কাদের উপর এই দায়িত্ব অর্পিত হয়? বর্ণনা কর।
৪.২৩ একজন স্ত্রী বা বিধবা কি পৃথক বাসস্থান এবং ভরণপোষণ দাবি করতে পারে?
৪.২৪ বিধবার ভরণপোষণের পরিমাণ কিভাবে নির্ধারিত হয়?
দায়ভাগ মদপন্থীরা একজন হিন্দু বালক কোন বালিকাকে বিবাহ করতে পারেনা।
১৯ ৪৬ সনের মেরিজ ডিজেভলিস রিমুভাল অ্যাক্ট কি কি অক্ষমতাকে দূর করেছে?
স্ত্রী ধন কি? নারীর সম্পত্তির সাথে স্ত্রী ধরনের তুলনা কর।
হিন্দু বিবাহ সম্পূর্ণ রূপে একটি পবিত্র বন্ধন' তুমি কি একমত? যুক্তি দেখাও।
অসর বন বিবাহ পদ্ধতিতে প্রাচীন হিন্দু আইনের রক্ষণশীলতাকে উপেক্ষা করে সময়ের চাহিদা পূরণ করেছে। তুমি কি এই বিষয়ে একমত যুক্তি দাও।
হিন্দু ভাইদের বিবাহ কোন চুক্তি নয় আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আলোচনা কর।
একটি বিশেষ বাংলাদেশী মামলার উল্লেখপূর্বক একটি হিন্দু বিবাহের জন্য প্রয়োজনীয় অনুষ্ঠান সম্পর্কে বর্ণনা কর।
মতবাদ বিকাশ অথবা সৃষ্টির কারণসমূহ ব্যাখ্যা কর।
একজন হিন্দু ক তার বিধবা স্ত্রী খ ভাই গ এবং এক পুত্র ঘ কে রেখে মারা যায়। হিন্দু দায়ভাগ আইন অনুসারে ক এর সম্পত্তি কে কি পরিমান পাবে এবং কেন পাবে ব্যাখ্যা কর।
একজন হিন্দু ক তার স্ত্রী খ মা গ এবং এক ভাই ঘ চাচা ঙ রেখে মারা গেল। কে কতটুকু সম্পত্তি পাবে? এবং কে স্টক অফ ডিসেন্ট হবে? উত্তর সাপেক্ষে যুক্তি দাও।
সব হিন্দুদের মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ণয়কারী নীতিগুলি আলোচনা কর।
দায়ভাগা মতবাদ অনুসারে বাটোয়ারীর বিধবা মায়ের অধিকার সমূহ আলোচনা কর।
দায়ভাগ আইনে বন্টন কি?;
বন্টনে কারা অংশ দাবি করতে পারে?
হিন্দু আইনে বাটোয়ারার বিধানগুলি আলোচনা কর।
যে দায়ভাগ আইনে বন্টন কি? বন্দরে কারা অংশ দাবি করতে পারে?
হিন্দু আইনে প্রতিনিধিত্ব মতবাদ দৈব উত্তরাধিকার মাথাপিছু অধিকার আলোচনা কর।
দত্তক গ্রহণ করার পর পুত্র সন্তান জন্মালে কি ঘটে?
স্বাভাবিক পুত্র ও দত্তক পুত্রের মধ্যে পার্থক্য কি?
কার্যত অভিভাবককে?
নাবালকের সম্প্রতি তিনিই কি লেনদেন করতে পারেন?
উইলের সংজ্ঞা দাও!
কে উই ল করতে পারে এবং কি উইল করা যায়?
দান এবং উইলের পার্থক্য নির্ণয় কর।
হিন্দু আইনে উইলের আনুষ্ঠানিকতা /পদ্ধতি কি কি?
হিন্দু যৌথ পরিবারের একজন কর্তার ক্ষমতা অধিকার ও কর্তব্যসমূহ আলোচনা কর।
অথবা যৌথ হিন্দু পরিবারের ম্যানেজারের ক্ষমতা ও কার্যাবলী বর্ণনা কর।
বাংলাদেশে হিন্দু আইনের মতে একজন কর্তার আইনানুপ পদমর্যাদা বর্ণনা করো।
হিন্দু যৌথ পরিবারের একজন কর্তার ক্ষমতা অধিকার ও কর্তব্যসমূহ আলোচনা কর।
দায়ভাগ আইনে বন্টন কি? বন্টনে কারা অংশ দাবি করতে পারে?
গ) টিকা-
১) ভরণ পোষণ
২) হিন্দু আইনে দেশান্তর গমন
৩) দান ,
৪) ভাবী উত্তরাধিকারী
৫) সেবাইতো
৬) সহ উত্তরাধিকারীকারীত্ব
৭) বিধবার সম্পত্তি
৮) সপিণ্ড
৯) প্রতিনিধিত্ব মতবাদ
১০) সহ অংশীদার
১১) স্টক অব ডিসেন্ট
১২) শ্রুতি
১৩) দত্তক
১৪) অনুমোদিত বিবাহ
১৫) ফ্যাকটোম ব্যালেট
৪.১ হিন্দু কে?
হিন্দু শব্দটি না হিন্দু জাতি প্রাচীন নয়। এটি আধুনিক শব্দ। প্রাচীনকালে আর্য জাতি, অনার্য জাতি, বা সনাতন ধর্ম ইত্যাদির প্রচলন ছিল। কালের বিবর্তনে হিন্দু নামের প্রচলন শুরু হয়েছে। হিন্দু ধর্ম মূলত বিভিন্ন ধর্মীয় বই, প্রথা, বা রীতিনীতি। বিভিন্ন আইন ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
হিন্দু কারা:
সাধারণত যারা হিন্দু ধর্মের অনুসারী তাদেরকে হিন্দু বলা হয়।
অনেকের মতে হিমালয়ের 'হি' এবং বিন্দুর 'ন্দ' এভাবে হিন্দু নামের উৎপত্তি হয়েছে।
কারো কারো মতে হিন্দুদের পূর্বপুরুষ আর্যগণ পারস্যের সিন্ধ নদের তীরে বাস করতেন। পারসিকরা স' কে 'হ' উচ্চারণ করত। কাজেই সিন্দুকে তারা হিন্দু বলতো।
পরিশেষে বলা যায় যারা হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করেন এবং হিন্দু পিতা মাতার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেই অনুসারে জীবন পরিচালনা করেন তাদেরকেই হিন্দু বলে।
নিম্নোক্ত ব্যক্তিবর্গ হিন্দু হিসেবে গণ্য:
১) হিন্দু পিতা মাতার বৈধ বা অবৈধ সন্তান
২) হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত ব্যক্তি
৩) জৈন, শিখ, আর্যসমাজ
৪) অন্য ধর্ম ত্যাগ করে হিন্দু ধর্ম গ্রহণকারী
৫) হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করার পর পুনরায় হিন্দু ধর্ম গ্রহণকারী
৬) হিন্দু ভাইজির পুত্র
হিন্দু জাতি মূলত চারটি জাতিতে বিভক্ত
১) ব্রাহ্মণ বা পুরোহিত শ্রেণী
২) ক্ষত্রিয় বা যুদ্ধা শ্রেণী
৩) বৈশ্য বা কৃষিজীবী বা ব্যবসায়ী শ্রেণী
৪) শূদ্র বা কর্মজীবী শ্রেণী
৪.২ হিন্দু আইন কি? হিন্দু আইনের উৎস ও প্রকৃতি ব্যাখ্যা কর।
হিন্দু আইন:
হিন্দু আইন রোমান আইনের ন্যায় শুধু সেকুলার আইন নয় বা এটি কোন বিধিবদ্ধ আইন নয়। এটি অধিকতর ধর্মীয় আইন।
সাধারণ আইন বলতে রাষ্ট্রীয় আইনকে বুঝায়। কিন্তু হিন্দু আইন রাষ্ট্রীয় আইন নয়।
হিন্দু আইনের সূত্রপাত কিভাবে হয়েছে তা সঠিক করে কেউ বলতে পারেনা। পন্ডিতের মতে সুদূর অতীতে এর সূত্রপাত হয়েছে। হিন্দু আইন রাজা-প্রজা সকলের উপর সমান কার্যকর। হিন্দুরা যখন হিন্দু আইনের স্রষ্টা ছিলেন না। তারা এর প্রয়োগকারী ছিলেন।
সুতরাং বলা যায় যে, হিন্দুদের ব্যক্তিগত পারিবারিক সামাজিক ধর্মীয় বা নৈতিক ইত্যাদি বিধান যে আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তাকে হিন্দু আইন বলে।
হিন্দু আইনের উৎস ও প্রকৃতি:
রাষ্ট্র কর্তৃ ক প্রণীত বিধান হল আইন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইন ছাড়াও আরও রীতিনীতি মানুষ পালন করে থাকে। এর পেছনে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব থাকে না। এগুলা সামাজিক আইন। হিন্দু সমাজের প্রচলিত এরূপ সামাজিক আইন হলো হিন্দু আইন।
অর্থাৎ যে সকল ধর্মীয় বিধি বিধান হিন্দুরা মেনে চলেন তাই হিন্দু আইন। হিন্দু আইন ঈশ্বরের মুখ নিঃসৃত বাণী। হিন্দু আইন রাজা প্রজা সকলের উপর সমান ভাবে কার্যকর ছিল। হিন্দু রাজারা এসব আইন প্রণয়ন করতে পারত না বা প্রয়োগ করতে পারত না। নিম্নে হিন্দু আইনের বিভিন্ন উৎস আলোচনা করা হলো:
১) শ্রুতি: শ্রুতির অপর নাম বেদ। এটি হিন্দুদের প্রাচীন ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। শ্রুতি অর্থ যা শোনা গেছে। এটি কোন ব্যক্তি বিশেষ রচিত গ্রন্থ নয়। শ্রুতি হল ঈশ্বরের মুখে নিঃসৃত বাণী। আর এই বাণীকে অভ্রান্ত বিবেচনা করা হয়। এটি একরকম ধর্ম সংগীত। শ্রুতির উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে হিন্দু আইন। অর্থাৎ শ্রুতি হল হিন্দু আইনের মূল উৎস। তবে মূল উৎস হলো একমাত্র উৎস নয়। যেমন স্মৃতি, পুরান, প্রথা, সংহিতা, বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত, বিধিবদ্ধ আইন ইত্যাদি।
২) স্মৃতি: স্মৃতির অপর নাম ধর্মশাস্ত্র। স্মৃতি অর্থ যা স্মরণ রাখা হয়েছে। স্মৃতির উপর ভিত্তি করে স্মৃতির রচিত হয়েছে। অর্থাৎ সিদ্ধ তার দিক দিয়ে শ্রুতির পরেই স্মৃতির স্থান। মুনি ঋষিগণ ঈশ্বরের যেসব বাণী স্মরণ রেখেছেন তাই স্মৃতি। মুনি ঋষিগণ স্মরণ রাখা সেসব বাণী পরবর্তীতে সংকলন করা হয়। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি মানুষের ভাষায় রচিত হলেও এর উৎস স্বর্গীয়। তাই হিন্দু আইনের অন্যতম উৎস হলো স্মৃতি। হিন্দু শাস্ত্রে বিধান অনুযায়ী স্মৃতি তিনটি। ১) মনু সংহিতা ২) যাজ্ঞাবল্ক্য সংকলন ৩) নারদ সংকলন।
সুতরাং সুতির উপর ভিত্তি করে হিন্দু আইন গড়ে উঠলেও স্মৃতি লিখিত থাকায় এবং মানুষের আচরণ সম্পর্কে বিধিবিধান থাকায় এটি বেশি নির্ভরযোগ্য । অনেকের মতে শ্রুতি এবং স্মৃতির মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে স্মৃতিকে প্রাধান্য দিতে হবে। তাই উঁচু হিসেবে স্মৃতি স্মৃতি অপেক্ষা বেশি যুগোপযোগী ও অধিক গ্রহণযোগ্য।
৪.৩ হিন্দু আইনের উৎস গুলি আলোচনা করো।
হিন্দু আইনের উৎস ও প্রকৃতি:
রাষ্ট্র কর্তৃ ক প্রণীত বিধান হল আইন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইন ছাড়াও আরও রীতিনীতি মানুষ পালন করে থাকে। এর পেছনে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব থাকে না। এগুলা সামাজিক আইন। হিন্দু সমাজের প্রচলিত এরূপ সামাজিক আইন হলো হিন্দু আইন।
অর্থাৎ যে সকল ধর্মীয় বিধি বিধান হিন্দুরা মেনে চলেন তাই হিন্দু আইন। হিন্দু আইন ঈশ্বরের মুখ নিঃসৃত বাণী। হিন্দু আইন রাজা প্রজা সকলের উপর সমান ভাবে কার্যকর ছিল। হিন্দু রাজারা এসব আইন প্রণয়ন করতে পারত না বা প্রয়োগ করতে পারত না। নিম্নে হিন্দু আইনের বিভিন্ন উৎস আলোচনা করা হলো:
১) শ্রুতি: শ্রুতির অপর নাম বেদ। এটি হিন্দুদের প্রাচীন ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। শ্রুতি অর্থ যা শোনা গেছে। এটি কোন ব্যক্তি বিশেষ রচিত গ্রন্থ নয়। শ্রুতি হল ঈশ্বরের মুখে নিঃসৃত বাণী। আর এই বাণীকে অভ্রান্ত বিবেচনা করা হয়। এটি একরকম ধর্ম সংগীত। শ্রুতির উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে হিন্দু আইন। অর্থাৎ শ্রুতি হল হিন্দু আইনের মূল উৎস। তবে মূল উৎস হলো একমাত্র উৎস নয়। যেমন স্মৃতি, পুরান, প্রথা, সংহিতা, বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত, বিধিবদ্ধ আইন ইত্যাদি।
২) স্মৃতি: স্মৃতির অপর নাম ধর্মশাস্ত্র। স্মৃতি অর্থ যা স্মরণ রাখা হয়েছে। স্মৃতির উপর ভিত্তি করে স্মৃতির রচিত হয়েছে। অর্থাৎ সিদ্ধ তার দিক দিয়ে শ্রুতির পরেই স্মৃতির স্থান। মুনি ঋষিগণ ঈশ্বরের যেসব বাণী স্মরণ রেখেছেন তাই স্মৃতি। মুনি ঋষিগণ স্মরণ রাখা সেসব বাণী পরবর্তীতে সংকলন করা হয়। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি মানুষের ভাষায় রচিত হলেও এর উৎস স্বর্গীয়। তাই হিন্দু আইনের অন্যতম উৎস হলো স্মৃতি। হিন্দু শাস্ত্রে বিধান অনুযায়ী স্মৃতি তিনটি। ১) মনু সংহিতা ২) যাজ্ঞাবল্ক্য সংকলন ৩) নারদ সংকলন।
সুতরাং সুতির উপর ভিত্তি করে হিন্দু আইন গড়ে উঠলেও স্মৃতি লিখিত থাকায় এবং মানুষের আচরণ সম্পর্কে বিধিবিধান থাকায় এটি বেশি নির্ভরযোগ্য । অনেকের মতে শ্রুতি এবং স্মৃতির মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে স্মৃতিকে প্রাধান্য দিতে হবে। তাই উঁচু হিসেবে স্মৃতি স্মৃতি অপেক্ষা বেশি যুগোপযোগী ও অধিক গ্রহণযোগ্য।
৩) পুরান: পুরান হিন্দু আইনের অন্যতম একটি উৎস। পুরাণের মোট সংখ্যা ১৮। কারো কারো মতে শ্রুতি এবং স্মৃতি এর নিকটবর্তী সময় পুরাণ এসেছে।
৪) পন্ডিতের ব্যাখ্যা: বিভিন্ন ক্ষেত্রে যখন কোন সমস্যা দেখা দেয় তখন তা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়। এরূপ ক্ষেত্রে পন্ডিতগণ নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সমাজের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন যা হিন্দু আইনের অন্যতম একটি উৎস হিসেবে স্থান পেয়েছে।
৫) প্রথা: হিন্দু আইনের অন্যতম প্রধান উৎস হলো প্রথা বা বিভিন্ন সংস্কার। প্রধান দীর্ঘদিন কোন সমাজে বর্তমান থেকে আইনের রূপ লাভ করে। প্রথা অলিখিত উৎস হলেও অনেক ক্ষেত্রে লিখিত আইনের চেয়েও বেশি শক্তিশালী।
৬) নজির: প্রথার ন্যায় নজির ও হিন্দু আইনের অন্যতম একটি উৎস। আদালতের পূর্ববর্তী কোনো সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে অনুসরণীয় হলে তখন তাকে নজির বলে। হিন্দু আইনে অনেক ক্ষেত্রেই নজির সমাদৃত হয়েছে।
৭) ফ্যাকটাম ভ্যালেট: ফ্যাকটাম ভ্যালেট এসেছে রোমান একটি প্রবচন থেকে। রোমান প্রবচন টি হল' উচিত নয় এমন কোন কাজ করে ফেললে সেটিকে অবৈধ গণ্য করা হবে না' অর্থাৎ যে কাজ করা উচিত নয় তা করে ফেললে কাজটি বৈধ বলে গণ্য হবে। ফ্যাকটাম ভ্যালেট সম্পর্কে আদালতের নীতি হলো, যে ক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা কার্যকারিতা নেই শুধু নির্দেশনা আছে সে ক্ষেত্রে ফেকটাম নীতি প্রযোজ্য। যেমন একমাত্র পুত্রকে দত্তক দেয়া যাবে না বা নেওয়া যাবে না। এটি একটি দিক নির্দেশক বিধি। কিন্তু একমাত্র পুত্রকে দত্তক দিলে বা গ্রহণ করলে তা অবৈধভাবে সেটিও বলা হয়নি। আদালত ফ্যাকটাম ভ্যালেট নীতি প্রয়োগ করে এরূপ দত্তক বৈধ বিবেচনা করেছেন। ( উমাদে বনাম গোকুলন্দ মামলা, ১৮৭৮)
আবার হিন্দু মতে নাবালিকার বিবাহের জন্য অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন। কিন্তু এ আইন অমান্য করে কেউ বিয়ে করলে এই নীতি অনুসারে উক্ত বিয়ে বৈধ বলে গণ্য হবে।
৮) আদালতের সিদ্ধান্ত: আদালত থেকে কোন সিদ্ধান্ত এলে তা মেনে চলা সকলের জন্য বাধ্যকর হয়ে যায়। বিভিন্ন সময় হিন্দুধর্ম সংক্রান্ত সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত সমাদৃত হয়েছে। কাজেই তা আইনের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
৪.৪ হিন্দু আইনের বিভিন্ন মতবাদ গুলো কি কি? দুটি মতবাদ ব্যাখ্যা কর।
বিভিন্ন কারণে হিন্দু আইনে বিভিন্ন মতবাদ তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো শ্রুতি ও স্মৃতির মধ্যে জটিলতা নিরসন। অর্থাৎ হিন্দু আইনের অন্যতম এই দুটি উৎসের জটিলতা নিদর্শন এর জন্য বিভিন্ন মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে।
নিম্নে হিন্দু আইনের বিভিন্ন মতবাদ উল্লেখ করা হলো
১) দায়ভাগ মতবাদ ( রচয়িতা- জিমুত বাহন)
২) মিতক্ষরা মতবাদ ( বিজ্ঞানেশ্বর)
৩) বিভেদ রত্নকর ( চন্ডেশ্বর )
৪) দত্তক চন্দ্রিমা ( নন্দ পন্ডিতকৃত)
৫) বিভেদ চিন্তামণি ( ভোজশপতি মিত্র )
৬) ব্যবহার মুয্যখ ( নীলকান্ত)
৭) দায়িতত্ত্ব ( রঘুনন্দন)
৮) স্মৃতি চন্দিকা ( দেবেন্দ্র ভট্ট)
৯) দয়া ক্রমন গ্রহ ( শ্রীকৃষ্ণ)
উপরোক্ত মতবাদ গুলির মধ্যে অধিকাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা দায়ভাগ ও মিতক্ষরা মতবাদ অনুসরণ করেন।
১) দায়ভাগ মতবাদ: দায়ভাগ মতে তিন শ্রেণীর লোক উত্তরাধিকার লাভ করেন। সপিন্ড, সকুল্য, সমানোদক।
দায়ভাগ মত অনুসারে উত্তরাধিকার নির্ণয়ের মূলনীতি:
১) সপিণ্ডদের উত্তরাধিকারীত্ব: প্রত্যেক ব্যক্তির সপিণ্ডরা উত্তরাধিকার লাভ করে থাকে। যারা মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে তাদেরকে সপিণ্ড বলে । প্রত্যেক ব্যক্তির উপর তিন পুরুষ এবং নিচের তিন পুরুষ তার সপিণ্ড। মহিলাদের মধ্যে স্ত্রী, কন্যা, মাতা , পিতা মহি, প্রপিতা মহি , সপিণ্ড পুরুষের উত্তরাধিকারী লাভ করেন।
২) উত্তরাধিকার নীতি: উত্তরাধিকার নীতিতে পুরুষগণ যে সকল সম্পত্তি অর্জন করেন তা সম্পূর্ণ মালিকানার ভিত্তিতে লাভ করেন। কিন্তু মহিলাগণ জীবনস্বত্বে উত্তরাধিকার লাভ করেন। মহিলাদের মৃত্যুর পর উক্ত সম্পত্তি মূল মালিকের নিকটবর্তী সপইন্ডদএর অনুকূলে ফেরত চলে যায়।
))) মিতক্ষরা মতবাদ:
দায়ভাগ মতে তিন শ্রেণীর লোক উত্তরাধিকার লাভ করেন। সপিন্ড, সমানোদক, বন্ধু।
বাংলাদেশে মৃতক্ষরা মতবাদের প্রচলন নেই।
মিতক্ষরা মতবাদ হল সংহিতা সমূহের ব্যাখ্যা মূলক একটি মতবাদ। এর রচয়িতা হলেন বিজ্ঞানেশ্বর।
দায়ভাগ মতবাদে পিতার মৃত্যুর পর তার পুত্র পিতার সম্পত্তিতে অধিকার লাভ করে। কিন্তু মিতাক্ষরা মতবাদের পিতার মৃত্যুর পর তার পুত্র পিতার সম্পত্তির অধিকার লাভ করে। সাথে পিতামহের সম্পত্তিতে ও অধিকার লাভ করে রক্তের সম্পর্কে এই মতবাদের উত্তরাধিকারের ভিত্তি ধরা হয়। মিতাক্ষরা মতবাদে অসতীত্বের কারণের শুধু বিধবা স্ত্রী সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়। কন্যা মাতা বোন ইত্যাদি নারীরা বঞ্চিত হয় না। এই মতবাদের পিতা জীবিত থাকলে পুত্র সম্পত্তির বন্টন দাবি করতে পারে। এখানে ফ্যাক্টোম ভ্যালেট মতবাদ সীমিত প্রয়োগ হয়।
৪.৫ মিতাক্ষরা এবং দায়ভাগ মতবাদের মধ্যে মৌলিক ব্যবধানগুলি আলোচনা কর।/ পার্থক্য লিখ।
নিমে দায়ভাগ ও মিতাক্ষরা মতবাদের মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করা হলো:
১) মতবাদ গত পার্থক্য: দায়ভাগ মতবাদ হলো সকল সংহিতা সমূহের সারসংক্ষেপ।
পক্ষান্তরে মৃতক্ষরা মতবাদ হল সংহিতা সমূহের ব্যাখ্যা।
২) প্রতিশব্দ গত পার্থক্য: দায়ভাগ মতবাদের ইংরেজি প্রতিশব্দ Dayabhaga school. পক্ষান্তরে মিতক্ষরা মতবাদের ইংরেজি প্রতিশব্দ mitakshara School.
৩) রচয়িতা গত পার্থক্য: দায়ভাগ মতবাদের রচয়িতা হলেন জি, মুতবাহন। পক্ষান্তরে মিতক্ষরা মতবাদের রচয়িতা হলেন বিজ্ঞানেশ্বর।
৪) পুত্রের সম্পদ লাভ গত পার্থক্য: দায়ভাগ মতবাদের পিতার মৃত্যুর পর পুত্র তার সম্পত্তির অধিকার লাভ করে।
পক্ষান্তরে মিতক্ষরা মতবাদে পিতার মৃত্যুর পর পুত্রের সম্পত্তির সাথে পিতামহর সম্পত্তি ও অধিকার লাভ করে।
৫) উত্তরাধিকারের ভিত্তিগত পার্থক্য: দায়ভাগ মতবাদে উত্তরাধিকারের ভিত্তি ধরা হয় পিন্ডদানকে। পক্ষান্তরে মিতক্ষরা মতবাদে উত্তরাধিকারের ভিত্তি ধরা হয় রক্তের সম্পর্ককে।
৬) অসতীত্বগত পার্থক্য: দায়ভাগ মতবাদে অসতী তত্ত্বের কারণে সকল ধরনের মহিলা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়। পক্ষান্তরে বিতক্ষরা মতবাদের অসতী তত্ত্বের কারণে শুধু বিধবা স্ত্রী সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়।
৭) সম্পত্তি দাবী গত পার্থক্য : দায়ভাগ মতবাদে পিতা জীবিত থাকলে পুত্রসম্পত্তির বন্টন দাবি করতে পারেনা। পক্ষান্তরে মৃতক্ষরা মতবাদের পিতা জীবিত থাকলে পুত্র সম্পত্তির বন্টন দাবি করতে পারে।
৮) ফেক্টম ভ্যালেট গত পার্থক্য: দায়বাগ মতবাদে ফেক্টম ভ্যালেট মতবাদ পরিপূর্ণ প্রয়োগ হয়। পক্ষান্তরে মৃতক্ষরা মতবাদের মতবাদ সীমিত প্রয়োগ হয়।
৯) মাতার দায়ভাগ: দায়ভাগ মতবাদে পিতার পর মাতা উত্তরাধিকার লাভ করে। পক্ষান্তরে মৃতক্ষরা মতবাদে পিতার পূর্বে মাতা উত্তরাধিকার লাভ করে।
১০) উত্তরাধিকারের শ্রেণীগত পার্থক্য: দায়ভাগ মতবাদে উত্তরাধিকার ১) সপিণ্ড, ২) সাকূল্য ,৩) সমানোদক। এই তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। পক্ষান্তরে মৃতক্ষরা মতবাদের উত্তরাধিকার সপিন্ড, সমানদক, বন্ধু। এই তিন শ্রেণীতে বিভক্ত।
৪.৬ একজন হিন্দু কিভাবে তার নিজের আইন বহন করে? উক্তিটি পর্যালোচনা কর। / অথবা যখন একটি হিন্দু এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যায় তখন সে কি তার ব্যক্তিগত আইন বহন করে? / হিন্দু আইন লেক্সনসি নয় বরং ব্যক্তিগত আইন।
যদি কোন হিন্দু বা তার পরিবার বসবাসের জন্য তাদের নিজের এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যায় তবুও তার আইনের কোন পরিবর্তন হয় না। তারা যেখানেই যাক না কেন সেখানেই তারা তাদের সংস্কার বা সামাজিকতা বা আঞ্চলিকতা বিধান মেনে চলেন। অর্থাৎ তাদের পারিবারিক প্রথা, উত্তরাধিকার বিধান, পরিবারের সদস্যদের সাথে সম্পর্ক ইত্যাদি আগের মতই বজায় রাখেন। এজন্য বলা হয় হিন্দু তার নিজের সাথে আইনও বহন করে।
যেমন: কোন হিন্দু পরিবার ভারতের কোন এক রাজ্য থেকে এসে বাংলাদেশের স্থায়ী বসবাস শুরু করল। পরিবারটি যে রাজ্য থেকে বাংলাদেশে আসলো সেই রাজ্যে মিতক্ষরা মতবাদ প্রচলিত। সমগ্র বাংলাদেশের যদি দায়ভাগ মতবাদের প্রচলন থাকে তবুও সেই পরিবারের উপর মিতক্ষরা আইন প্রযোজ্য হবে।
আবার বিপরীত অর্থে বাংলাদেশ থেকে কোন পরিবার ভারত গিয়ে স্থায়ী বসবাস শুরু করল। তারা ভারতের যে রাজ্যে বসবাস শুরু করল সে রাজ্যে মিতক্ষরা মতবাদ প্রচলিত। বাংলাদেশের যেহেতু তার দায়ভাগ মতবাদ অনুসারী ছিল ভারতে গিয়েও তাদের উপর দায়ভাগ মতবাদ প্রযোজ্য হবে। শ্রীমতি পার্বতী বনাম জগদীশ মামলা ( ১৯০২) উপরের মত সমর্থন করে।
৪.৭ হিন্দু আইনের নিয়ম অনুযায়ী ' প্রথার ব্যবহার রীতি সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকলে তা আইনের লিখিত ধারাকে অগ্রাহ্য করতে পারে' এই উক্তিটি একটি মুখ্য মামলার নজির উল্লেখপূর্বক বর্ণনা কর। অথবা হিন্দু আইনের সুবিদিত প্রথা শত গ্রন্থ থেকে ও শক্তিশালী আলোচনা কর।
হিন্দু আইনের অন্যতম প্রধান উৎস হলো প্রথা বা বিভিন্ন সংস্কার। তথা দীর্ঘদিন কোন সমাজে বর্তমান থেকে আইনে রূপ লাভ করেছে। প্রথা অলিখিত উৎস হলেও অনেক ক্ষেত্রে লিখিত আইনের চেয়েও বেশি শক্তিশালী।
গোপাল চন্দ্র সরকার বলেন, কথা হলো এমন নিয়ম যা একটি বিশেষ পরিবার বা কোন জেলায় বহুদিন ধরে প্রচলিত হওয়ার ফলে আইনে পরিণত হয়েছে।
মনু বলেন , 'সদাচার ভিত্তিক প্রথা আইনের পর্যায় ভুক্ত হতে পারে'।
প্রথা অবশ্যই প্রাচীন ও যুক্তিযুক্ত হতে হবে। অনেকের মতে কোন বিভাগ নিরসনের জন্য প্রথাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত।
সুতরাং বলা যায় প্রথার সুস্পষ্ট প্রথা লিখিত আইনের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
৪.৮ বাংলাদেশের প্রচলিত হিন্দু আইনের উত্তরাধিকারের সাধারণ নীতিসমূহ আলোচনা কর।/ হিন্দু দায়ভাগ অনুসারে উত্তরাধিকার নির্ণয়ের মূলনীতি গুলো আলোচনা কর।
নিম্নে দায়ভাগ মত অনুসারে উত্তরাধিকার নির্ণয়ের মূলনীতিগুলো আলোচনা করা হলো:
১) সপিন্ডদের উত্তরাধিকারীত্ব: প্রত্যেক ব্যক্তির সবইন্দরা উত্তরাধিকার লাভ করে থাকে। যারা মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে তাদেরকে সপিন্ড বলে। প্রত্যেক ব্যক্তির উপর তিন পুরুষ এবং নিচের তিন পুরুষ তার সপিন্ড । মহিলাদের মধ্যেই স্ত্রী কন্যা মাতা পিতামহি প্র পিতামহী সপিণ্ড পুরুষের উত্তরাধিকার লাভ করেন।
২) উত্তরাধিকারের নীতি: উত্তরাধিকার নীতিতে পুরুষগণ যে সকল সম্পত্তি অর্জন করেন তা সম্পূর্ণ মালিকানার ভিত্তিতে লাভ করেন। কিন্তু মহিলাগণ জীবনস্বত্বে উত্তরাধিকার লাভ করেন। মহিলাদের মৃত্যুর পর উক্ত সম্পত্তি মূল মালিকের নিকটবর্তী সপিণ্ডদের অনুকূলে ফেরত চলে যায়।
৩) উত্তর জিবি নীতি: দুটি ক্ষেত্রে উত্তজীবী নীতি প্রয়োগ করা হয়। যেমন কোন ব্যক্তি দুই স্ত্রী রেখে মৃত্যুবরণ করলে । তারা জীবনস্বত্বে উত্তরাধিকারী লাভ করেন। অতঃপর একজন স্ত্রী মৃত্যুবরণ করলে অপর স্ত্রী উত্তরজীবী হিসেবে মৃত স্ত্রী সম্পত্তি প্রাপ্ত হবেন।
৪) প্রতিনিধিত্ব মতবাদ: কোন ব্যক্তির পুত্র, পুত্রের পুত্র, পুত্রের পুত্রের পুত্র প্রতিনিধিত্ব মতবাদ অনুযায়ী উত্তরাধিকার লাভ করেন।
৫) সমান উত্তরাধিকারীত্ব: যে সকল উত্তরাধিকার সম্পত্তি লাভ করেন তারা সকলেই সমান অংশ প্রাপ্ত হন। তবে মৃত ব্যক্তির এক স্ত্রী থাকলেও এক পুত্রের সমান অংশপ্রাপ্ত হবে। একাধিক স্ত্রী থাকলো এক পুত্রের সমান অংশপ্রাপ্ত হবে।
৪.৯ দায়ভাগ মত অনুসারে হিন্দু আইনে কারা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয় এবং কেন? / উত্তরাধিকার অর্জনে অক্ষমতার কারণ কি এবং কেন? / বাংলাদেশের হিন্দু আইনে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবার কারণগুলো বর্ণনা কর।
হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার আত্মার মঙ্গলের জন্য উত্তরাধিকারীগণ উত্তরাধিকার লাভ করেন। নিম্নে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ উল্লেখ করা হলো:
১) অসতি স্ত্রী: কোন ব্যক্তির মৃত্যুর সময় যদি তার স্ত্রী অসতি থাকে তাহলে সেই স্ত্রী তার স্বামীর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার লাভ করবে না। তবে সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করার পর অসতী হলে পরবর্তী কাজের জন্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে না।
২) অন্যান্য অসতী নারী: দায়ভাগ মত অনুযায়ী অসতী স্ত্রীর ন্যায় অন্যান্য অসতী নারী যেমন কন্যা মাতা, বোন ইত্যাদি ব্যক্তি পুরুষের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। তবে অসতীত্বের কারণে কোন স্ত্রী লোকের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে না।
৩) শারীরিক বা মানসিক অসুস্থ্যতা: অন্ধ, বধির, পাগল, পুরুষত্বহীন, সহযাত হাবা, দুরারোগ্য ব্যাধি ইত্যাদিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা দায়ভাগ মত অনুযায়ী উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
৪) মহিলাদের অক্ষমতা: যে সকল কারণে কোন পুরুষ উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয় সেই সকল কারণে একজন নারী ও বঞ্চিত হয়।
৫) ধর্মচ্যুতি: কোন ব্যক্তি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করলে সে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
৬) সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ: কোন ব্যক্তি সংসদ ধর্ম ছেড়ে সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করলে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
৭) নরহত্যা করলে: কোন ব্যক্তি যদি কোন ব্যক্তির হত্যাকারী হয় তাহলে তার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
৪.১০ প্রণীত আইন দ্বারা এগুলোর কিরূপ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে?/ হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে কি কি পরিবর্তন আনা হয়েছে?
১) বিধবা স্ত্রীর অধিকার: পূর্বে দায়বাগ মতে বাংলাদেশে যৌথ পরিবারের সকল বিধবা ভরণ পোষণ পেতেন। কোন পুরুষ মৃত্যুবরণ করলে তার স্ত্রী এক পুত্রের সমান অংশ ভরণপোষণ হিসেবে পেতেন। অর্থাৎ তিনি সম্পত্তি পৃথক করে নিতে পারতেন না। পরবর্তীতে এই আইন সংশোধিত হয়েছে। বর্তমানে কোন পুরুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যতগুলি স্ত্রী থাকবে তারা একত্রে এক পুত্রের সমান অংশ জীবনস্বত্বের অধিকারী হবে। প্রয়োজন হলে সে বা তারা তাদের অংশ পৃথক করে নিতে পারবে।
২) পুত্র, পৌত্র, প্রপৌত্রদর বিধবা স্ত্রীর অধিকার: পূর্বে পুত্র, পুত্রের পুত্র, পুত্রের পুত্রের পুত্রদের স্ত্রীরা শুধু ভরণ পোষণ পেত। কোন সম্পত্তি লাভ করত না। বর্তমানে উক্ত পুরুষদের যতগুলো স্ত্রী থাকবে তারা এক পুত্রের সমান জীবনস্বত্বের অধিকারী হবেন। প্রয়োজন হলে সে বা তারা তাদের অংশ পৃথক করে নিতে পারবে।
৩) কৃষি জমিতে অধিকার: পূর্বে হিন্দু নারীদের অধিকার কৃষি জমির জন্য প্রযোজ্য ছিল না। শুধু অকৃষি জমির জন্য কতদূর ছিল। বর্তমানে শুধু সিলেট জেলায় হিন্দু নারীরা কৃষি জমিতে অধিকার লাভ করে। এর জন্য পৃথক একটি আইন রয়েছে। যার নাম- আসাম হিন্দু ওমেন্স রাইট টু প্রপার্টি'। সিলেট এক সময় আসামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই আইনটি নিয়ে সিলেট বাংলাদেশের সাথে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের অন্য কোন জেলায় এই আইনটি নেই। অর্থাৎ অন্য কোন জেলায় হিন্দু নারীরা কৃষি জমিতে উত্তরাধিকার লাভ করে না।
৪.১১ হিন্দু বিবাহ ও এর উদেশ্য।
পৃথিবীর সকল ধর্মেই বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন। সুতরাং হিন্দু ধর্মেও বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন। বিবাহের মাধ্যমে প্রার্থীব আনন্দের পাশাপাশি পরজগতে মুক্তির ব্যবস্থা হয়। অর্থাৎ বিবাহের মাধ্যমে দেহ ও আত্মাকে যেমন পরিশুদ্ধ করা যায় তেমনি ঈশ্বরের অনুগ্রহও লাভ করা যায়।
হিন্দু বিবাহ: বিয়ে হলো নারী পুরুষের বৈধ বা স্বীকৃত দৈহিক ও আত্মিক মিলন। বৈদিক মতে অস্থির সাথে অস্থি, মজ্জার সাথে মজ্জার মিলনকে বিয়ে বলে। অর্থাৎ দেবতাকে সাক্ষী রেখে ধর্মীয় আচার মেনে কন্যাদান ও কন্যাগ্রহণ ক্রিয়া-ই হলো হিন্দু বিয়ে।
)) হিন্দু বিবাহের উদ্দেশ্য:
হিন্দু ধর্ম মতে দশটি সংস্কার আছে। তার অন্যতম একটি হলো বিয়ে। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী বিয়ে একটি ধর্মীয় সংস্কার। হিন্দু মতে বিয়ের আগে নারী এবং পুরুষকে অসম্পূর্ণ বলে মনে করা হয়। বিয়ের পর তারা সম্পূর্ণ হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বৈধ উপায়ে সন্তান উৎপাদন ও ধর্মীয় আচার সম্পাদন। বংশ রক্ষার জন্য পুত্র সন্তান প্রয়োজন। তেমন পিন্ডদান শ্রাদ্ধ ইত্যাদির মাধ্যমে পুং নামক নরক থেকে রক্ষার জন্য ও পুত্র প্রয়োজন। দেখা যায় বিয়ের মাধ্যমে দেহ যেমন পবিত্র হয় তেমনি পরজাগতিক কল্যাণও হয়।
৪.১২ বৈধ বিবাহের আবশ্যকীয় উপাদান/শর্ত গুলো কি কি লিখ।
হিন্দু বিবাহের শর্ত বা উপাদান: হিন্দু বিয়ের সম্পন্ন হতে হলে তার কিছু শর্ত বা উপাদান আছে। নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো:
১) বর কনের বর্ণ: হিন্দু বিবাহ সম্পাদনে বর এবং কনের বর্ণ একই হতে হবে।
২) আচার অনুষ্ঠান সম্পাদন: হিন্দু বিবাহের ধর্মীয় বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতে হবে।
৩) বর কনের সম্মতি: অন্যান্য ধর্মের মতে হিন্দু বিবাহের ক্ষেত্রেও বর এবং কনের উভয় সম্মতি থাকতে হবে।
৪) অভিভাবকের সম্মতি: শুধু বর্কনের সম্মতি থাকলে হবে না তাদের অভিভাবকের ও সম্মতি প্রয়োজন। কনের ক্ষেত্রে তার পিতার সম্মতি গ্রহন করতে হবে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে কনের মা সম্মতি দিতে পারেন।
৫) বয়স: বর এবং কোণে বিবাহযোগ্য বয়সের অধিকারী হতে হবে। অর্থাৎ দুজনকেই সাবালোক ও সাবালিকা হতে হবে।
৬) বিধি সম্মত পদ্ধতি: হিন্দু আইনে চারটি অনুমোদিত বিয়ে আছে। এই চারটি যেকোনো এক পদ্ধতিতে বিয়ে হতে হবে।
৭) শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা: হিন্দু আইন অনুযায়ী কোন অভিভাবক নর বা নারীর বিয়ে অবৈধ বলে গণ্য হবে। তাই বিয়ের জন্য বর এবং অনেকে শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে সুস্থ থাকতে হবে।
৪.১৩ হিন্দু বিবাহের ধর্মীয় ও পার্থিব গুরুত্ব আলোচনা কর।
নিম্নে হিন্দু বিবাহের ধর্মীয় ও পার্থিব গুরুত্ব আলোচনা করা হলো:
ধর্মীয় গুরুত্ব:
হিন্দুশাস্ত্রে দশটি পবিত্র অনুষ্ঠানের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি হলো বিয়ে। যেহেতু হিন্দু শাস্ত্রের মধ্যেই বিয়ে কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেহেতু এটি শুধু একটি চুক্তি নয়, এটি ধর্মীয় সংস্কার হিসেবেও অভিহিত। কারণ পুত্রহীন লোকদের স্বর্গে স্থান হয় না। পিন্ডদান ও শ্রাদ্ধ ইত্যাদি দ্বারা পিতাকে এবং পূর্বপুরুষদের আত্মাকে পুত্র নরক থেকে বাঁচিয়ে স্বর্গের সুখ লাভে সহায়তা করতে পারে। আর বৈধ পুত্রের জন্য বিয়ে অন্যতম মাধ্যম। তাছাড়া হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী মানুষের দেহ জন্মসূত্রে অপবিত্র। বিয়ে দ্বারা পুরুষ তার দেহকে পবিত্র করে এবং নারীর আত্মশুদ্ধি হয়। স্বামী যতদিন বেঁচে থাকেন ততদিন তিনি শ্রী নিকট দেবতা হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে স্ত্রী ও স্বামীর অর্ধাঙ্গিনী। একে অন্যের ভালো বা মন্দের ভাগীদার। মনুর মতে, নারীকে সম্মান দেয়া হলে ঈশ্বর খুশি হন। তাদের সম্মান দেয়া না হলে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে কোন ফল লাভ হয় না।
পার্থিব গুরুত্ব:
ধর্মীয় দিক ছাড়াও বিয়ের পার্থিব গুরুত্ব আছে। বিধিসম্মত বিয়েতে বর এবং কনেপক্ষের সম্মতি, কন্যা সম্পাদন, কন্যাগ্রহণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে দানের প্রার্থী উপাদান অপরিহার্য। একজন অস্বাভাবিক পুরুষ বিয়ে করতে পারে না। তার বিয়ে অবৈধ বলে গণ্য। এছাড়া যেকোনো প্রতারণামূলক বিয়ে অবৈধ। বিয়ে শুধু শারীরিক চাহিদা পূরণের জন্যই নয়। বিয়ের মাধ্যমে একজন নারী তার স্বামীর পরিবারের সম্মানিত সদস্যরূপে গণ্য হন। এভাবে বিয়ের মাধ্যমে দুটি প্রাণ এক প্রাণে পরিণত হয়।
উপসংহার: হিন্দু ধর্মে আট ধরনের বিবাহের উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে সব ধরনের বিবাহ প্রচলিত নেই। বর্তমানে শুধু ব্রহ্মবিবাহ ও অসুর বিবাহের প্রচলন দেখা যায়। তবে প্রচলন না থাকলেও হিন্দু আইনে যে সকল বিবাহের উল্লেখ আছে সেই সকল পদ্ধতিতে বিবাহ সম্পন্ন করলে তা আইনত বৈধ হবে। তারা পরস্পর পরস্পরের উত্তরাধিকারী সহ অন্যান্য সুবিধা লাভের অধিকারী হবে।
৪.১৪ হিন্দু বিবাহের প্রকারভেদ ।
হিন্দি বিবাহে কে ৮ ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১) ব্রহ্মবিবাহ, ২) দৈব বিবাহ, ৩) অর্শ বিবাহ, ৪) প্রজাপতিয় বিবাহ, ৫) গন্ধর্ববিবাহ, ৬)অশুর বিবাহ, ৭) রাক্ষস বিবাহ, ৮) পৈশাচ বিবাহ।
এই আট ধরনের বিবাহ দুই ভাগে বিভক্ত
ক) অনুমোদিত বিবাহ ( প্রথম চারটি) ,খ) অননুমোদিত বিবাহ ( দ্বিতীয় চারটি)
ক) অনুমোদিত বিবাহ
১) ব্রহ্মবিবাহ: যে বিবাহের কন্যার পিতা বা অভিভাবক বরের নিকট থেকে কোন রকম কোন গ্রহণ করে না সেটি হলো ব্রহ্মবিবাহ। এই ক্ষেত্রে কর্নার পিতা বা অভিভাবক উত্তম চরিত্রের পাত্র খুঁজে বের করে তাকে কন্যাদান করেন। পূর্বেই শুধু ব্রাহ্মণ সমাজেই বিয়ের প্রচলন থাকলেও বর্তমানে একজন শূদ্রও এই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন।
২) দৈববিবাহ: যে বিবাহ কন্যাকে কোন মন্দির বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের যাজকের নিকট সম্প্রদান করা হয়। এবং কর্ণের পিতা বা অভিভাবক দক্ষিণার পরবর্তীতে বিবাহ বলিদানের ব্যবস্থা করেন তাকে বিবাহ বলে। এই বিবাহে কন্যার প্রতি অভিভাবকের বরের নিকট থেকে সুবিধা গ্রহণ করে।
৩) অর্শ্ববিবাহ: যে বিবাহের কন্যার পিতা বা অভিভাবক বড় একজোড়া গাভী উপহার দেন তাকে অশ্রবিবাহ বলে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে এই উপহার গ্রহণ করা হয়।
৪) প্রজাপতি ও বিবাহ। এটি অনেকটা ব্রহ্ম বিবাহের মতো। তবে এই বিবাহে বরকে অবহিত না করলেও চলবে। এই বিবাহ একটি শর্ত থাকে। আর তা হল তোমরা দুজন ইহলোক ও ধর্মীয় কাজের সমান অংশীদার হবে।
খ) অনঅনুমোদিত বিবাহ
১) গন্ধর্ববিবাহ; যে বিয়ের বর এবং কলের পারস্পরিক ইচ্ছা বা সম্মতির মাধ্যমে হয়ে থাকে তাকে গন্ধর্ব বিবাহ বলে। অর্থাৎ যে ক্ষেত্রে কনের কোন অভিভাবক থাকে না এবং পাত্র পাত্রীর ইচ্ছা বা সম্মতির মাধ্যমে যৌন মিলন হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে গন্ধব বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়।
২) অসুর বিবাহ: যে বিবাহে কনের পিতা বা অভিভাবক কন্যাকে শুল্কের বিনিময়ে ভরের নিকট দান করেন তাকে অসুর বিবাহ বলে।
৩) রাক্ষস বিবাহ: আটক করে বা জোর করে যে বিবাহ সম্পন্ন করা হয়ে থাকে রাক্ষস বিবাহ বলা হয়।
৪) পৈশাচ বিবাহ:
কোন ব্যক্তি কোন মেয়ের সাথে ঘুমন্ত অবস্থায় বা মাতাল অবস্থায় যৌন মিলন করলে যে বিবাহ হয় তাকে পৈশাচ বিবাহ বলে। তবে হিন্দু আইনে বিবাহের অর্থ এই নয় যে এই রূপ প্রতারণা বৈধ। যে হিন্দু আইনে নারীর সতীত্ব এবং একক স্বামীর উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। এজন্য ধর্ষণকারী কর্তৃক বিবাহের বিধান রয়েছে।
৪.১৫ দত্তক কি? হিন্দু আইনে বৈধ দত্তকের শর্তাবলী কি?
দত্তক শব্দের অর্থ অর্পিত বা প্রদত্ত, হিন্দু আইন অনুযায়ী পার্থিব ও পরজন্মীয় মঙ্গলের জন্য প্রত্যেক ব্যক্তির পুত্র সন্তান থাকা জরুরি। প্রার্থীব কারণ হলো নিজ বংশের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। আর পরজন্মিও কারণ হলো পিতার শ্রাদ্ধে পিণ্ড জল নিবেদন করা। যার দ্বারা পিতা পাপ মুক্ত হয় এবং পুণ্যঘ' নামক নরক থেকে রক্ষা পায়।
দত্তক adoption in Hindu law: দত্তক প্রথার প্রাচীন ইতিহাস আর্যদের সময় হতে পাওয়া যায়। দত্ত গ্রহণ বা দত্ত প্রদান হিন্দু আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। মূলত দাম্পত্য জীবনে ব্যর্থতা বা অনিশ্চয়তা দত্তক কথার জন্ম দিয়েছে।
কোন বয়স্ক পুরুষ বা মহিলা শর্তসাপেক্ষে কর্তৃক কোন ছেলে শিশুকে বৈধ পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক স্থাপনের জন্য গ্রহণ করাকে দত্ত বলে। বাংলাদেশ ও ভারতের দত্তক প্রথা আইনগত প্রক্রিয়া হিসেবে বিদ্যমান।
হিন্দু আইন অনুযায়ী অন্যের পুত্র কে নিজের পুত্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়াকে দত্ত বলে।
তবে অন্য ধর্মে বিশেষ করে মুসলিম ধর্মের দত্ত গ্রহণের স্বীকৃতি দেখা যায় না।
দত্তক গ্রহণের শর্ত বা উপাদান:
কোন ব্যক্তি কোন পুত্র সন্তানকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করতে হলে নিম্নের শর্ত বা উপাদান থাকতে হবে।
১) দত্ত গ্রহণকারীর দত্ত গ্রহণের আইনগত ক্ষমতা থাকতে হবে
২) দত্ত প্রদানকারী দত্ত প্রদানের আইনগত ক্ষমতা থাকতে হবে।
৩) জাতিগতভাবে বা বর্ণগতভাবে দত্তক দেওয়া বা নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে।
৪) দত্তক কাজে প্রকৃত প্রধান ও গ্রহণ থাকতে হবে
৫) দত্ত হোম অনুষ্ঠান সম্পাদন করতে হবে।
৬) সম্মতি থাকতে হবে।
৪.১৬ কে দত্তক গ্রহণ করতে পারে?
যে সকল ব্যক্তি গণতন্ত্র গ্রহণ করতে পারেন তারা হলেন:
যে সকল ব্যক্তি গণতন্ত্র গ্রহণ করতে পারেন তারা হলেন:
১) প্রত্যেক সুস্থ স্বাভাবিক পুরুষ ব্যক্তি
২) যে সুস্থ পুরুষের পুত্র বা পুত্রের পুত্র নেই।
৩) স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় তার সম্মতিতে স্ত্রী দত্ত গ্রহণ করতে পারেন।
৪) স্বামী ক্ষমতা দিয়ে গেলে বিধবা নারীও দত্ত গ্রহণ করতে পারেন।
৪.১৭ এবং কাকে দত্তক গ্রহণ করা যায় আলোচনা কর।
যেকোনো পুত্র সন্তানকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। হিন্দু আইন অনুযায়ী যাদেরকে দত্ত গ্রহণ করা যায় তাদের পরিচয় উল্লেখ করা হলো: ১) কোন পুরুষ সন্তানকে দত্ত গ্রহণ করা যায়। অর্থাৎ কোন কন্যা সন্তানকে দত্ত গ্রহণ করা যায় ন।
২) স্বাভাবিক সন্তানকে দত্ত গ্রহণ করা যায়। অর্থাৎ কোন বোবা বা বধির কে দত্ত গ্রহণ করা যায় না।
৩) ভারতের কিছু কিছু রাজ্যে শুধু অবিবাহিত পুরুষ সন্তানকে দত্ত গ্রহণ করা যায়।
৪) দত্তকদাতা এবং দত্তক গ্রহীতা একই বর্ণের হতে হবে।
৫) উক্ত সন্ধানটি এমন মায়ের সন্তান হতে হবে যার সাথে দত্ত গ্রহীতার বিবাহ আইনসম্মত।
৪.১৮ বোনের ছেলেকে কি দত্তক গ্রহণ করা যায়?
হিন্দু আইন অনুযায়ী কোন ছেলেকে দত্ত গ্রহণ করতে হলে কিছু শর্ত পালন করতে হয়
। যেমন- পুরুষ সন্তান, স্বাভাবিক সন্তান, একই বর্ণের ইত্যাদি।
দত্ত গ্রহণের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো। - উক্ত সন্ধান দিয়ে এমন মায়ের সন্তান হতে হবে যার সাথে দত্ত গ্রহীতার বিবাহ আইনসম্মত। অর্থাৎ যার সাথে বিবাহ বৈধ নয় তার সন্তানকে দত্ত গ্রহণ করা যায় না
বোনের সাথে বিবাহ বৈধ নয়। সুতরাং বোনের ছেলেকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। তবে উচ্চ বর্ণীয় হিন্দুদের জন্য এই প্রচলন থাকলেও শূদ্রদের উপর এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
পরিশেষে বলা যায় বোনের ছেলেকে দত্ত গ্রহণ করা যায় না।
৪.১৯ একমাত্র পুত্রকে দত্তক গ্রহণ করা কি বৈধ?
একমাত্র পুত্রকে দত্ত গ্রহণ করা যায় কিনা তা নিয়ে মুনি ঋষিদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত রয়েছে।
হিন্দু আইন অনুযায়ী সাধারণত দুটি কারণে দত্ত গ্রহণ করা হয়। ১) পার্থিব কারণ অর্থাৎ বংশের রক্ষা জন্য এবং (২) পরজন্মীয় মঙ্গলের জন্য।
অর্থাৎ পিতার শ্রাদ্ধে পিণ্ড জল নিবেদন করার জন্য যার দ্বারা পিতা পাপ মুক্ত হয় এবং পূণ্যঘ নামক নরক থেকে রক্ষা পায় ।
কোন ব্যক্তির যদি একটি মাত্র পুত্র থাকে তাহলে উপরোক্ত দুটি কারণ ই ব্যর্থ হবে। অর্থাৎ তার নিজ বংশের রক্ষা হবে না পাশাপাশি হিন্দু আইন অনুযায়ী তার পিতা নরক থেকে রক্ষা পাবে না।
এই হিসাবে একমাত্র পুত্রকে দত্ত গ্রহণ করা যায় না।
কিন্তু টিভি কাউন্সিল ১৮৯৯ সাল এক মামলার মাধ্যমে একমাত্র পুত্রকে দত্তক হিসেবে গ্রহণকে সমর্থন করেন।
পরিশেষে বলা যায় হিন্দু আইন অনুযায়ী বর্তমানে একমাত্র পুত্রকে দত্ত গ্রহণ করা যায়।
৪.২০ কোন হিন্দু বা বিধবা মৃত স্বামীর আগাম অনুমতি ছাড়া দত্তক গ্রহণ করতে পারে কি?
হিন্দু মহিলা তার স্বামীর পূর্ব অনুমতি ব্যতীত দত্ত গ্রহণ করতে পারে কিনা এ নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে। কোন কোন মত অনুযায়ী হিন্দু মহিলা তার স্বামীর পূর্ব অনুমতি ব্যতীত দত্ত গ্রহণ করতে পারেন। আবার কোন কোন মত অনুযায়ী হিন্দু মহিলা তার স্বামীর পূর্ব অনুমতি ব্যতীত দত্তক গ্রহণ করতে পারে না।
কোন কোন মত অনুযায়ী শর্তসাপেক্ষে হিন্দু মহিলা তার স্বামীর পূর্ব অনুমতি ব্যতীত দত্তক গ্রহণ করতে পারেন।
যেমন:
ক) স্বামী নিষেধ করে না গেলে বিধবা স্ত্রী দত্ত গ্রহণ করতে পারবেন।
খ) মৃত্যুর সময় স্বামী স্ত্রী এক স্থানের না থাকলে উক্ত বিধবা তার শ্বশুরের অনুমতি নিয়ে দত্ত গ্রহণ করতে পারবেন।
গ) যদি শশুর না থাকেন তাহলে তার কোন সপিণ্ড থেকে অনুমতি নিয়ে তথ্য গ্রহণ করতে পারবেন।
সুতরাং বলা যায় শর্তসাপেক্ষে হিন্দু মহিলা তার স্বামীর পূর্ব অনুমতি ব্যতীত দত্ত গ্রহণ করতে পারেন। মামলা: কালেক্টর (মাদুরা) বনাম মুক্তোর আম লিঙ্গ।
৪.২১ বাংলাদেশের কোন কায়স্থ কি নমশূদ্রকে দত্তক গ্রহণ করতে পারে?
হিন্দু ধর্ম চারটি জাতিতে বিভক্ত। যথা- ক) ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, এবং শূদ্র।
দত্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই সকল জাতির মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
যেমন- এক জাতি থেকে অন্য জাতির মধ্যে দত্ত গ্রহণ করা হলে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু এই জাতির বৃহৎ আয়ত্তার মধ্যে দত্তক গ্রহণ করা হলে সেই দত্তকের বিষয় কোন প্রশ্ন তোলা যায় না। এর কারণ হলো- এই ধরনের দত্ত একই জাতির ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে সংঘটিত হয়েছে মাত্র।
বাংলাদেশের একজন কায়স্থ কোন শূদ্রকে দত্ত গ্রহণ করতে পারে। কারণ বাংলাদেশের কায়স্থ ও নমঃশূদ্র একই শূদ্র শ্রেণি ভুক্ত।
এই প্রসঙ্গে একটি নজির উল্লেখ করা যেতে পারে। সুধাংশু শেখরদের বনাম অনাথ বন্ধু মামলার আদালত সিদ্ধান্ত প্রদান করে যে, বাংলাদেশের গা
কায়স্থ গন শূদ্র। হিন্দু আইন অনুযায়ী একজন কায়স্থ কোন নম শূদ্র কে দত্ত গ্রহণ করার তে বাধা নেই। তারা উভয় শ্রেণীর শুদ্র বলে গণ্য হবে। সুতরাং বলা যায় বাংলাদেশের কোন কায়স্থ কোন নমঃশূদ্রকে দত্ত গ্রহণ করতে পারে।
৪.২২ হিন্দু আইনে ভরণপোষণ কাকে বলে?
অভিভাবকগণের অধীনস্থ পোষ্যদের রক্ষণা বেক্ষণের দায় দায়িত্ব কে ভরণপোষণ বলে।
অর্থাৎ একজন অভিভাবক তার স্ত্রী ও অধীনস্থদের জন্য যে সকল খরচ করতে বাধ্য থাকেন তাকে ভরণপোষণ বলে।
৪.২৩ হিন্দু আইন অনুযায়ী কারা ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী? কাদের উপর এই দায়িত্ব অর্পিত হয়? বর্ণনা কর।
হিন্দু আইন অনুযায়ী নিম্নের ব্যক্তিগণ ভরণপোষণ দাবি করতে পারে।
১) পুত্র: পুত্র যদি নাবালক হয় তাহলে পিতা তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবেন।
২) কন্যা: কন্যাদের বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত পিতা তাদের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবেন।
৩) স্ত্রী: স্ত্রী সব সময় ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারীনী। তবে স্ত্রী অসতী হলে ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন না।
৪) বিধবা স্ত্রী: স্ত্রী সতী হলে স্বামী মারা যাওয়ার পর তার সম্পত্তি থেকে ভন পোষণ পাবেন।
৫) পিতা মাতা: পিতা মাতা যদি নিজেদের ভরণ পোষণ ব্যয় নির্বাহ না করতে পারেন তাহলে পুত্র তাদের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবেন।
৬) যৌথ পরিবারের সদস্য: যৌথ পরিবারের কর্তা পরিবারের সকল সদস্যের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবেন।
৭) অবৈধ পুত্র: পুত্রের ন্যায় অবৈধ পুত্রকেও পিতা তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবেন।
৮) অন্যান্য উত্তরাধিকারী: অন্যান্য উত্তর অধিকারী যদি অক্ষম হয় তাহলে তাদের ভরণপোষণ প্রদান করতে হয়।
৯) বোন: বোন যদি সম্পত্তিতে অধিকার লাভ করে তাহলে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারীনি হবেন।
১০) রক্ষিতা: রক্ষিত থাকলে তিনিও ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারীনী হবেন।
৪.২৩ একজন স্ত্রী বা বিধবা কি পৃথক বাসস্থান এবং ভরণপোষণ দাবি করতে পারে?
একজন হিন্দু স্ত্রী সব সময় ভরণ-পোষণ পাওয়ার অধিকারীনী। স্বামী জীবিত থাকলেও ভরণ-পোষণ পাবেন, স্বামী মৃত্যুবরণ করলেও ভরণপোষণ পাবেন। যুক্তিসঙ্গত কারণে পৃথক বসবাস করলেও তিনি ভরণ পোষণ পাবেন। কারণ একজন বিধবা তার স্বামীর গৃহে বসবাস করতে বাধ্য নয়। অর্থাৎ পৃথক বসবাস করলেও তিনি ভরণ পোষণের অধিকার হারান না।
তবে উইলের মাধ্যমে স্ত্রীকে তার আত্মীয়দের সাথে বসবাসের শর্ত দিয়ে যায় তাহলে পৃথক বসবাস করলে তিনি বহন পোষণ দাবি করতে পারবেন না। এছাড়ায় স্ত্রী যদি অসতী হয় তাহলে ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন না। সুতরাং বলা যায় একজন হিন্দু স্ত্রী যদি সতি হয় এবং যুক্তিসঙ্গত কারণে পৃথক বসবাস করেন তাহলে তিনি ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন।
৪.২৪ বিধবার ভরণপোষণের পরিমাণ কিভাবে নির্ধারিত হয়?
ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ: নিম্নে ভরণপোষণের পরিমাণ উল্লেখ করা হলো:
একজন হিন্দু স্ত্রী সংগতিপূর্ণভাবে জীবন যাপন করতে পারে এবং তার জন্য এমন ভরণপোষণ নির্ধারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে তার সম্পত্তির পরিমাণ বিবেচনায় আনা হবে। অর্থাৎ স্ত্রী ধরনের পরিমাণ হিসেব করতে হবে । বিধবার আশার-আচরণ বিবেচনা করতে হবে। স্ত্রীর সতীত্ব বিবেচনা করতে হবে। স্ত্রী অসতী হলে ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত হবে। এছাড়া পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে ভরণ পোষণ কম বেশি হতে পারে।
No comments:
Post a Comment