৩.১। মৌলিক অধিকার কাকে বলে? / মৌলিক অধিকার কি সাধারণ আইনের মত পরিবর্তন করা যায়?
৩.২। বাংলাদেশ সংবিধানের উল্লেখিত বিভিন্ন প্রকার মৌলিক অধিকারসমূহ কি কি আলোচনা কর।
৩.৩। যে সমস্ত মৌলিক অধিকারগুলো শুধুমাত্র বাংলাদেশের নাগরিক গণই ভোগ করতে পারে তা আলোচনা কর। / মৌলিক অধিকার ভোগের উপর আরোপিত শর্তসমূহ কি কি? / বাংলাদেশ শাসনতন্ত্রে মৌলিক অধিকার সমূহের বিবরণ।
৩.৪। কোন মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র অথবা পার্লামেন্ট বা আইনসভা পুনরুপ বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারে না?
৩.৫। কোন মৌলিক অধিকারের উপর বাধা নিষেধ আরোপ করা যায়? / কি কি কারণে এই বাধানিষেধ আরোপ করা হয়।?
৩.৬ । কেন সুপ্রিম কোর্ট কে মৌলিক অধিকারের রক্ষক বলা হয়? / সুপ্রিম কোর্ট কে মৌলিক অধিকারের অভিভাবক ও নিশ্চয়তা দানকারী বলা হয় কেন? / সুপ্রিম কোর্ট কিভাবে মৌলিক অধিকার গুলির সংরক্ষণ করে? / জাতীয় সংসদের সংবিধানের ঘোষিত মৌলিক অধিকার পরিপন্থী কোন আইন প্রণয়ন করলে তার ফলাফল কি হবে?
৩.৭। মৌলিক অধিকার সমূহের কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৪ এবং ১০২ অনুচ্ছেদ সমূহের বিধান বোর্ড আলোচনা কর। / সংবিধানের ৪৪ ও ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কিভাবে মৌলিক অধিকার বলবৎ করা যায়? / কিভাবে মৌলিক অধিকারগুলো কার্যকর করা যায়?
৩.৮। পঞ্চম সংশোধনীতে মৌলিক অধিকার সম্পর্কে কি বলা হয়েছে?
৩.৯। মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় কর।
৩.১০। মৌলিক অধিকার ও মানবিক অধিকারের মধ্যে পার্থক্য দেখাও।
৩.১১ । বাংলাদেশ সংবিধানের মৌলিক অধিকার অধ্যায় সমতা সম্পর্কিত বিধান।
৩.১। মৌলিক অধিকার কাকে বলে? / মৌলিক অধিকার কি সাধারণ আইনের মত পরিবর্তন করা যায়?
মানুষ তার বিকাশ লাভের জন্য গতিপয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করে যার নৈতিক ও আইনগত ভিত্তি আছে। এগুলোকে অধিকার বলে ।
মৌলিক অধিকার fundamental rights:
যে অধিকারগুলো মানুষের সুষ্ঠু স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য অপরিহার্য, দেশের সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত এবং আদালত দ্বারা বলবৎযোগ্য সেই অধিকারগুলোকে মৌলিক অধিকার বলে । সকল মৌলিক অধিকারই মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত। দেশের সর্বোচ্চ আইন হলো সংবিধান । মৌলিক অধিকারগুলো দেশের সর্বোচ্চ আইনি লিপিবদ্ধ। যার ফলে শাসন বিভাগ বা আইন বিভাগ ইচ্ছে করলেই অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে পারে না । সাংবিধানিক বিশেষ প্রক্রিয়ায় একে রক্ষা করতে হয়। একে পরিবর্তন করতে হলে সংবিধানকেই সংশোধন করতে হয়।
৩.২। বাংলাদেশ সংবিধানের উল্লেখিত বিভিন্ন প্রকার মৌলিক অধিকারসমূহ কি কি আলোচনা কর।
সংবিধানে উল্লেখিত মৌলিক অধিকার
বাংলাদেশ সংবিধানে মোট ১৮ টি মৌলিক অধিকার উল্লেখ আছে । উল্লেখিত সবগুলি মৌলিক অধিকারী বাংলাদেশের সকল নাগরিক ভোগ করতে পারেন। কিন্তু এর মধ্যে ছয়টি মৌলিক অধিকার বাংলাদেশের নাগরিকের সাথে বিদেশীরা ভোগ করে থাকে। নিম্নে সংবিধানের উল্লেখিত মৌলিক অধিকার গুলো উল্লেখ করা হলো:
১) আইনের দৃষ্টিতে সমতার অধিকার
২( ধর্মের কারণে বৈষম্য
৩) সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সমতা
৪) বিদেশি খেতাব গ্রহণ নিষিদ্ধকর
৫) আইনের আশ্রয় লাভ
৬) চলাফেরার স্বাধীনতা
৭) সমাবেশ করার স্বাধীনতা
৮) সংগঠন করার স্বাধীনতা
৯) বাক স্বাধীনতা
১০) পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা
১১) সম্পত্তি অর্জনের অধিকার
১২) গৃহ ও যোগাযোগ রক্ষার অধিকার
১৩) জীবনের অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার
১৪) জবরদস্তি শ্রম থেকে রক্ষার অধিকার
১৫) দন্ড থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার
১৬) ধর্মীয় স্বাধীনতা
১৮) সংবিধান অনুযায়ী প্রতিকার লাভের অধিকার।
৩.৩। যে সমস্ত মৌলিক অধিকারগুলো শুধুমাত্র বাংলাদেশের নাগরিক গণই ভোগ করতে পারে তা আলোচনা কর। / মৌলিক অধিকার ভোগের উপর আরোপিত শর্তসমূহ কি কি? / বাংলাদেশ শাসনতন্ত্রে মৌলিক অধিকার সমূহের বিবরণ।
যে সকল মৌলিক অধিকার শুধুমাত্র বাংলাদেশেরই ভোগ করে::
সংবিধানে ২৭ থেকে ৪৪ পর্যন্ত মোট ১৮ টি মৌলিক অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে- ২৭ থেকে ৩১ পর্যন্ত মোট পাঁচটি
৩৬ থেকে ৪০ পর্যন্ত পাঁচটি
৪২ থেকে ৪৩ পর্যন্ত দুইটি
সর্বমোট 12 টি মৌলিক অধিকার শুধু বাংলাদেশের নাগরিক ভোগ করতে পারেন।
নিম্ন তা উল্লেখ করা হলো:
১) আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান: আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান এবং সকলেই সমানভাবে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী। কিন্তু যারা বাংলাদেশের নাগরিক নং তারা এই অধিকার অন্তর্ভুক্ত নন। ( অনুচ্ছেদ ২৭)
২) ধর্ম বর্ণের কারণে বৈষম্য হীনতা: ধর্ম বর্ণ গোষ্ঠী নারী পুরুষ বা জন্মস্থানের কারণে রাষ্ট্র কারো প্রতি বৈষম্য আচরণ করবে না। নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন। ( অনুচ্ছেদ ২৮)
৩) সরকারি নিয়োগ: প্রজাতন্ত্রের কাজে বাংলাদেশের সকল নাগরিকই শুধু নিয়োগ লাভ করতে পারবে। অনুচ্ছেদ 29
৪) বিদেশি খেতাব না নেয়া: রাষ্ট্রপতির পূর্ব অনুমোদন ব্যতীত কেউ বিদেশী রাষ্ট্রের নিকট থেকে কোন খেতাব সম্মান পুরস্কার বা ভূষণ গ্রহণ করবেন না। অনুচ্ছেদ ৩০
৫) আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার: এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না যাতে ব্যক্তির জীবন স্বাধীনতা দেহ সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে। অনুচ্ছেদ ৩১
৬) চলাফেরা ও বসবাসের স্বাধীনতা: বাংলাদেশের নাগরিকগণ দেশের যে কোন স্থানে ওবাধে চলাফেরা ও বসবাস করতে পারবেন। অনুচ্ছেদ ৩৬
৭) সমাবেশের স্বাধীনতা: বাংলাদেশের নাগরিকগণ শান্তিপূর্ণ ও নিরস্র অবস্থায় সমাবেশ ও সভাযাত্রা করতে পারবেন। অনুচ্ছেদ ৩৭
৮) সংগঠনের স্বাধীনতা: সংবিধানের পরিপন্থী, ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট, নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি বা জঙ্গীকার্য পরিচালনার উদ্দেশ্য না থাকলে সকলেরই সংগঠন করার অধিকার থাকবে। অনুচ্ছেদ 38
৯) বাক স্বাধীনতা: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্ন ,অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বিনষ্ট ,আদালত অবমাননা, মানহানি ,অপরাধের প্ররোচনা না হলে সকলেই নিজ নিজ মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। অনুচ্ছেদ 39
১০) পেশা বৃত্তি ব্যবসা করার অধিকার: বাংলাদেশের নাগরিকগণ আইনসঙ্গত পেশা বৃত্তি বা যে কোন ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। অনুচ্ছেদ ৪০
১১) সম্পত্তির অধিকার: বাংলাদেশের নাগরিকগণ আইনে নিষেধ না থাকলে সম্পত্তি অর্জন, হস্তান্তর বা বিলি করতে পারবেন। অনুচ্ছেদ ৪২।
১২) গৃহ যোগাযোগ রক্ষণ: বাংলাদেশের নাগরিকগণ যুক্তিসঙ্গত বাধা নিষেধ ছাড়া স্বীয় গৃহে তল্লাশি বা আটক থেকে নিরাপত্তা লাভ করবেন এবং চিঠিপত্র বা অন্যান্য যোগাযোগ গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারী হবেন। ৪৩।
৩.৪। কোন মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র অথবা পার্লামেন্ট বা আইনসভা পুনরুপ বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারে না?
মৌলিক অধিকারের উপর আইনসভা কখনো বিদেশের আরোপ করতে পারে এবং কখনো বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে না নিম নেতা আলোচনা করা হলো।
বিধি নিষেধ আরোপ করতে পারে না:
১) আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান: আগে দৃষ্টিতে সকলেই সমান এবং সকলকেই সমানভাবে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী। কিন্তু যারা বাংলাদেশের নাগরিক নন তারা এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত নন। অনুচ্ছেদ ২৭।
২) জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধকরণ: আইন দ্বারা আবশ্যক না হলে সকল প্রকার জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ। কেউ নিয়ম ভঙ্গ করলে ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডনীয় হবে। অনুচ্ছেদ ৩৪।
৩) exposed fracture legislation এর অধীনে বিচার থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার: সংবিধানের 35 (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাউকে আক পোস্ট ফ্যাক্ট এর অধীনে বিচার করতে পারে না। অপরাধ সংগঠনকালে বলবৎ ছিল কেবলমাত্র এই রূপ আইনের অধীনেই বিচার করতে হবে।
৪) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় স্বাধীনতা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উপাসনায় অংশগ্রহণ বা যোগদান করতে হবে না। অনুচ্ছেদ ৪১ (১)।
৩.৫। কোন মৌলিক অধিকারের উপর বাধা নিষেধ আরোপ করা যায়? / কি কি কারণে এই বাধানিষেধ আরোপ করা হয়।?
যে সকল মৌলিক অধিকারের উপর যুক্তিসঙ্গত কারণে রাষ্ট্র অথবা পার্লামেন্ট অথবা আইনসভা কোন রূপ বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারে।
১) চলাফেরার স্বাধীনতা: জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত এবং যুক্তিসংগত কারণে কোন ব্যক্তির চলাফেরার উপর পার্লামেন্ট বাধা-নিষেধ আরোপ করতে পারে। অনুচ্ছেদ ৩৬
২) সমাবেশের অধিকার: জনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত এবং যুক্তিসঙ্গত কারণে কোন ব্যক্তির সমাবেশ করার উপর পার্লামেন্ট বাধা-নিষেধ আরোপ করতে পারে। অনুচ্ছেদ ৩৭
৩) সংগঠনের অধিকার: জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত এবং যুক্তিসঙ্গত কারণে কোন ব্যক্তির সংগঠন করার উপর পার্লামেন্ট বাধা-নিষেধ আরোপ করতে পারে। অনুচ্ছেদ ৩৮
৪) বাক স্বাধীনতা: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্ন, অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বিনষ্ট , আদালত অবমাননা, মানহানি, অপরাধের প্ররোচনায় ইত্যাদি কারণে পার্লামেন্ট কোন ব্যক্তির বাক্স স্বাধীনতার উপর বাধা নিষেধ আরোপ করতে পারে । অনুচ্ছেদ ঊনত্রিশ ৩৯
৫) ধর্মীয় স্বাধীনতা: আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর রাষ্ট্র অথবা পার্লামেন্ট বা আইনসভা কোনরূপ বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারে। অনুচ্ছেদ ৪১
৬) গৃহ যোগাযোগ রক্ষণ: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জনশ্রিংখলা নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরবিতে যুক্তিসঙ্গত কারণে গৃহ যোগাযোগ রক্ষণের উপর রাষ্ট্র অথবা পার্লামেন্ট অথবা আইনসভা অনুরূপ বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারে। অনুচ্ছেদ ৪৩
৩.৬ । কেন সুপ্রিম কোর্ট কে মৌলিক অধিকারের রক্ষক বলা হয়? / সুপ্রিম কোর্ট কে মৌলিক অধিকারের অভিভাবক ও নিশ্চয়তা দানকারী বলা হয় কেন? / সুপ্রিম কোর্ট কিভাবে মৌলিক অধিকার গুলির সংরক্ষণ করে? / জাতীয় সংসদের সংবিধানের ঘোষিত মৌলিক অধিকার পরিপন্থী কোন আইন প্রণয়ন করলে তার ফলাফল কি হবে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ থেকে ৪৪ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ মৌলিক অধিকার গুলি সংবিধান দ্বারা সংরক্ষিত। এই মৌলিক অধিকার গুলি বলবত করার দায়িত্ব ও ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এই সম্পর্কে অনুচ্ছেদ ৪৪ এবং অনুচ্ছেদ ১০২ এর বিধান রয়েছে।
দেশের শাসন বিভাগ বা বিচার বিভাগ এই মৌলিক অধিকার গুলিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। পাশাপাশি শাসন বিভাগ বা বিচার বিভাগ জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী কোন আইন ও প্রণয়ন করতে পারেনা। জনগণকে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের পরিবন্দী কোন আইন প্রণয়ন না করার জন্য সকল বিভাগকে সংবিধান নির্দেশ প্রদান করেছে।
যেমন: সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী- রাষ্ট্র মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোন আইন প্রণয়ন করবে না। যদি তদ্রুপ কোন আইন প্রণয়ন করে তাহলে তা সম্পূর্ণ যদি কোন ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হয় তাহলে প্রতিকারের জন্য সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিভাগ মামলায় দায়ের করা যায়। মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হলে সুপ্রিম কোর্ট ছাড়া অন্য কোন কর্তৃপক্ষ তা বলবধ করতে পারে না।
সুতরাং বলা যায় সুপ্রিম কোর্ট কেই মৌলিক অধিকারের অভিভাবক ও নিশ্চয়তা দানকারী বা মৌলিক অধিকার করে।
৩.৭। মৌলিক অধিকার সমূহের কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৪ এবং ১০২ অনুচ্ছেদ সমূহের বিধান বোর্ড আলোচনা কর। / সংবিধানের ৪৪ ও ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কিভাবে মৌলিক অধিকার বলবৎ করা যায়? / কিভাবে মৌলিক অধিকারগুলো কার্যকর করা যায়?
বাংলাদেশ সংবিধানের ২৬ থেকে ৪৭ ক অনুচ্ছেদ পর্যন্ত জনগণের মৌলিক অধিকার লিপিবদ্ধ হয়েছে। মোট 18 টি অনুচ্ছেদের মধ্যে বারটি অনুচ্ছেদে উল্লেখিত মৌলিক অধিকার শুধু বাংলাদেশী নাগরিকরাই ভোগ করতে পারে।
আর ছয় জন অনুচ্ছেদে উল্লিখিত মৌলিক অধিকার বাংলাদেশী এবং বিদেশি সকলেই ভোগ করতে পারে।
এই অধিকার গুলি রক্ষা করার দায়িত্ব বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের।
সংবিধানের ৪৪ ও ১০২ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী জনগণের মৌলিক অধিকার বলবদ করা যায়। সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণকে মৌলিক অধিকার বলবদ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। যে পুনঃ নাগরিক মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হলে তিনি সংবিধান 102 অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে অথবা ক্ষমতাপ্রাপ্ত আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন।
এই ধরনের মামলা দায়ের হলে হাইকোর্ট অথবা ক্ষমতার প্রাপ্ত আদালত মৌলিক অধিকার রক্ষার পক্ষে রায় দিবেন।।
৩.৮। পঞ্চম সংশোধনীতে মৌলিক অধিকার সম্পর্কে কি বলা হয়েছে?
জাতীয় সংসদে এ সংশোধনী আনা হয় ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল। পঞ্চম সংশোধনী সংবিধানে কোনো বিধান সংশোধন করেনি। এ সংশোধনী ১৯৭৫ এর ১৫ অগাস্টে সামরিক শাসন জারির পর থেকে ৬ এপ্রিল ১৯৭৯ পর্যন্ত সামরিক শাসনামলের সব আদেশ, ঘোষণা ও দণ্ডাদেশ বৈধ বলে অনুমোদন করে। এ সংশোধনীটি উচ্চ আদালতের রায়ে বাতিল হয়।
রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পর অভ্যুত্থানকারী সেনাসদস্যদের সমর্থনে খন্দকার মোশতাক আহমদ নতুন সরকার গঠন করে। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তিনি অভ্যুত্থানে জড়িতদের দায়মুক্তি দিয়ে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষ্যে জারিকৃত দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশ ১৯৭২ প্রত্যাহার করেন।
পরে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিধান সরিয়ে দেন এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ভোটার ও সংসদ সদস্য হওয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।
উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন
১। সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিস্মিল্লাহির-রহ্মানির রহিম’ সংযোজন করা হয়।
২। সংবিধান থেকে "বাঙালি জাতীয়তাবাদ" অপসারণ করে এবং "বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ" অন্তর্ভূক্ত করা হয়।
৩। ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যকে হত্যাকারী সেনা কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দিয়ে জারি করে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
৪। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হইতে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল তারিখ পর্যন্ত সামরিক সরকারের সকল কার্যাবলীর বৈধতা দেওয়া হয়।
৫। এতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় এবং উক্ত দলগুলোর নিবন্ধনের অনুমতি দেওয়া হয়।
৬। সংবিধানের মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে সংবিধানের প্রস্তাবনার আগে "সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস" যুক্ত করেছে।
৭। সংবিধানের মূলনীতিতে থাকা সমাজতন্ত্রকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে "সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায় বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র" রাখা হয় ।
৮। এটি সমাজতন্ত্রকে অপসারণ করে এবং শোষণ থেকে স্বাধীনতা ক্রমবর্ধমান স্থানীয় সরকার এবং মহিলাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে।
৯। ২৫(২) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে বলা হয়, ‘রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ ও জোরদার করিতে সচেষ্ট হইবেন।
৩.৯। মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় কর।
নিম্নে মৌলিক অধিকার ও মূলনীতির মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করা হলো:
১) সংজ্ঞা গত পার্থক্য: নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রদত্ত অপরিহার্য সুযোগ-সুবিধা হল মৌলিক অধিকার। পক্ষান্তরে যে সকল মূলসূত্র প্রয়োগ করে রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করে তাকে মূলনীতি বলে।
২) প্রতিশব্দ গত: মৌলিক অধিকার কে ইংরেজিতে fundamental rights বলে। পক্ষান্তরে মূলনীতিকে ইংরেজিতে Fundamental principles বলে।
৩) বাতিল যোগ্যতা: মৌলিক অধিকার পরিপন্থী আইন প্রণয়ন করা হলে তা আদালতে বাতিলযোগ্য হয়। পক্ষান্তরে মূলনীতিবিরোধী কোন আইন প্রণয়ন হলে আদালতে তা বাতিলযোগ্য হয় না।
৪) প্রাধান্যগত: মৌলিক অধিকার ও মূলনীতির মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে মৌলিক অধিকার প্রাধান্য পাবে। পক্ষান্তরে মৌলিক অধিকার ও মূলনীতির মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে মূলনীতি প্রাধান্য পাবে না।
৫) অনুচ্ছেদগত: সংবিধানের ২৬ থেকে ৪৭ ক অনুচ্ছেদ পর্যন্ত মৌলিক অধিকার বর্ণিত হয়েছে। পক্ষান্তরে সংবিধানের ৮ থেকে ২৫ অনুচ্ছেদে মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে।
৬) লংঘন গত: মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন হলে আদালতে তার প্রতিকার পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে মূলনীতি লঙ্ঘন হলে আদালতে প্রতিকার পাওয়া যায় না।
চ) প্রযোজ্যগত: মৌলিক অধিকার নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য। পক্ষান্তরে মূলনীতি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
৩.১০। মৌলিক অধিকার ও মানবিক অধিকারের মধ্যে পার্থক্য দেখাও।
সকল মৌলিক অধিকার মানবাধিকারের অন্তর্গত হলেও এদের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো:
১) সংজ্ঞা গত পার্থক্য: যে অধিকারগুলো মানুষের সুষ্ঠু এবং স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য অপরিহার্য, দেশের সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত এবং আদালত দ্বারা বলবৎযোগ্য সেই অধিকারগুলোকে মৌলিক অধিকার বলে। পক্ষান্তরে যে অধিকারগুলো মানুষ জন্মগতভাবে লাভ করে অর্থাৎ human being হিসেবে মানুষ যে অধিকার লাভ করে তাকে মানবাধিকার বলে।
২) প্রতি শব্দগত: মৌলিক অধিকারের ইংরেজি প্রতিশব্দ - fundamental rights. পক্ষান্তরে মানবাধিকারের ইংরেজি প্রতিশব্দ human rights.
৩) উৎসগত: মৌলিক অধিকারের উৎস হলো সংবিধান। পক্ষান্তরে মানবাধিকারের উৎস হল প্রকৃতি বা আন্তর্জাতিক আইন।
৪) বলবৎ গত: মৌলিক অধিকার আদালতের মাধ্যমে বলবৎ করা যায়। পক্ষান্তরে সকল মানবাধিকার আদালতের মাধ্যমে বলবৎ করা যায় না।
৫) সংরক্ষণ গত: মৌলিক অধিকার সংবিধান দ্বারা সংরক্ষণ করা হয় । পক্ষান্তরে সকল মানবাধিকার সংবিধান দ্বারা সংরক্ষণ করা হয় না।
৬) স্থগিত গত: মৌলিক অধিকার আদালত দ্বারা স্থগিত করা যায়। পক্ষান্তরে সকল মানবাধিকার আদালত দ্বারা স্থগিত করা যায় না।
৭) ব্যাপকতাগত: সকল মৌলিক অধিকারই মানবাধিকার। পক্ষান্তরে সকল মানবাধিকার মৌলিক অধিকার নয়।
৮) ভৌগলিক অবস্থান: মৌলিক অধিকার নির্দিষ্ট কোন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। পক্ষান্তরে মানবাধিকার নির্দিষ্ট কোন দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
৯) প্রয়োগগত : মৌলিক অধিকার নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য। পক্ষান্তরে মানবাধিকার পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য।
৩.১১ । বাংলাদেশ সংবিধানের মৌলিক অধিকার অধ্যায় সমতা সম্পর্কিত বিধান।
নিম্নে বাংলাদেশ সংবিধানের মৌলিক অধিকার অধ্যায়ে সমতা সম্পর্কিত বিধান উল্লেখ করা হলো:
১) সকল নাগরিক সমান: সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান।
২) বৈষম্য না করা: সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্ম বর্ণ গোষ্ঠী নারী পুরুষ ভেদে অথবা জন্ম স্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা যাবে না। সর্বস্তরের নারী পুরুষ সমান অধিকার লাভ করবে। তবে কোনো এলাকার নারী ও শিশুরা যদি অনগ্রসর হয়ে থাকে তাহলে তাদের অগ্রগতির জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করা যাবে।
৩) সরকারি নিয়োগে সমতা: সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকারি যেকোনো কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে সকলের সমান অধিকার পাবে।
৪) আইনের আশ্রয় লাভ: সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের যেকোনো ব্যক্তি আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী হবে। বিধান ব্যতীত কোন ব্যক্তির জীবন দেহ স্বাধীনতা সুনাম সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না।
No comments:
Post a Comment