Friday, March 31, 2023

ষষ্ঠ ভাগ (বিচারবিভাগ)ঃ সুপ্রীম কোর্ট, অধস্তন আদালত, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, রীট

৬.১।  বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের কাঠামো ও গঠন প্রণালী বর্ণনা কর। 

৬.২ ।  সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের অধিক্ষেত্র ও ক্ষমতা ব্যাখ্যা কর। / কার্যাবলী ও ক্ষমতা ব্যাখ্যা কর। 


৬.৩।  হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগের বিচারক নিয়োগ কিভাবে করা যায়? / সুপ্রিম কোর্টের ( হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ) বিচারকদের নিয়োগ পদ্ধতি।

৬.৪ ।   বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলতে কি বুঝ? 

৬.৫।   বাংলাদেশের বিচার বিভাগ কি স্বাধীন? /  বিচার সংক্রান্ত কার্যসম্পাদনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা কতটা স্বাধীন? / আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গুরুত্ব আলোচনা কর। 

৬.৬।   মাসদার হোসেন বনাম বাংলাদেশ মামলা ১৯৯৯ এর সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন কর। 

৬.৭।  রীট বলতে কি বুঝ? 

৬.৮ ।    রীট পিটিশানের পূর্ব শর্তগুলি কি কি? / কেন বলার হয়ে থাকে যে, বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদকে বিভিন্ন প্রকার রীটের নাম উল্লেখ না হলেও প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিজের প্রকৃত উপাদান বিশেষভাবে ধারণকৃত, বাক্যসমূহের বর্ণিত হয়েছে।  / বিভিন্ন প্রকার রীটের বর্ণনা দাও। / সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদে রীটের শর্তাবলী পাওয়া যায়, তবে এটি ১০২ অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়, ব্যাখ্যা কর।

৬.৯।  কে রীটের জন্য আবেদন করতে পারে?
 
৬.১০।  কাদের বিরুদ্ধে রীট আবেদন করা যায় না? /  রীটের সীমাবদ্ধতা কি?



৬.১।  বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের কাঠামো ও গঠন প্রণালী বর্ণনা কর। 


বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের নাম বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। এটি আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত। একজন প্রধান বিচারপতি এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারপতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট গঠিত। প্রধান বিচারপতি সহ সকল বিচারপতিদের বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করেন।

সুপ্রিম কোর্টের গঠন বা কাঠামো: 

বাংলাদেশ সংবিধান এর ৯৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট নামে একটি সর্বোচ্চ আদালত থাকবে। 
এর দুটি বিভাগ থাকবে:
১) আপিল বিভাগ , ২) হাইকোর্ট বিভাগ
একজন প্রধান বিচারপতি এবং প্রত্যেক বিভাগে আসন গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতি যতজন প্রয়োজন মনে করবেন ততজন বিচারপতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট গঠিত হবে।

রাষ্ট্রপতি সরাসরি প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দান করেন। প্রধান বিচারপতি সাথে পরামর্শ করে তিনি অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগ দেন।


৬.২ ।  সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের অধিক্ষেত্র ও ক্ষমতা ব্যাখ্যা কর। / কার্যাবলী ও ক্ষমতা ব্যাখ্যা কর। 


সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা ও কার্যাবলী কে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

১) হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতা ও কার্যাবলী
২) আপিল বিভাগের ক্ষমতা ও কার্যাবলী

১) হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতাও কার্যাবলী: 

নিম্নে হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতা ও কার্যাবলী আলোচনা করা হলো:
ক) আদি এখতিয়ার: যে ক্ষমতা বলে কোর্ট প্রাথমিকভাবে মামলা গ্রহণ করতে পারে তাকে আদি এখতিয়ার বলে। হাইকোর্ট বিভাগ সংসদ কর্তৃক পাসকৃত ও নির্ধারিত কোন মামলা প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করতে পারে। 

খ) আপিল এখতিয়ার: সংসদ যেকোনো আইনে হাইকোর্ট বিভাগের উপর আপিল এখতিয়ার প্রদান করতে পারে।

গ) রিভিশনাল এখতিয়ার: অধনস্থ আদালতের রায় পরীক্ষা করাই হলো রিভিশন। দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫ ধারায় হাইকোর্টকে রিভিশনাল এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। 

ঘ) রেফারেন্স এখতিয়ার: অধীনস্থ আদালতের মামলার আইনগত প্রশ্ন পরীক্ষা করে তার উপর মতামত দেওয়া হলো রেফারেন্স। দেওয়ানি কার্যবিধি ১১৩ ধারায় হাইকোর্টকে রিভিশনাল এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। ‌‌
ঙ) মৌলিক অধিকার বলবৎ করন: হাইকোর্ট বিভাগ কোন ব্যক্তি বা কতৃপক্ষের সংবিধানে উল্লেখিত মৌলিক অধিকারগুলো বলব বলবধ করার জন্য যে কোন আদেশ দিতে পারে। 

চ) নিম্ন আদালত সমূহের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ: 
হাইকোর্ট বিভাগ নিম্ন আদালত ও ট্রাইবুনালের উপর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ মূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। তবে শর্ত হলো নিম্ন আদালতের বা ট্রাইব্যুনালকে অবশ্যই হাইকোর্ট বিভাগের অধীনস্থ হতে হবে। 

ছ) অধীনস্থ আদালতের মামলা হস্তান্তর:
হাইকোর্ট বিভাগ তার অধীনস্থ আদালতের কোন মামলা নিজের কাছে আনতে পারে। তবে এই শর্ত হলো হাইকোর্ট বিভাগ যদি মনে করে কোন মামলায় সংবিধানের ব্যাখ্যা জনিত আইনের জটিলত প্রশ্ন জড়িত অথবা জনস্বার্থমূলক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত তাহলে উত্তম মামলা অধনস্থ আদালত থেকে তুলে এনে হাইকোর্ট বিভাগের নিজের নিষ্পত্তি করতে পারে।

জ) সরকারি কর্মচারী বা কর্তৃপক্ষকে কোন কাছ থেকে বিরত রাখা: হাইকোর্ট বিভাগ কোন সংক্ষুব্দ্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে সরকার কর্মচারী বা কর্তৃপক্ষের কাজ করা থেকে বিরত থাকার আদেশ প্রদান করতে পারে। 

ঝ) কোন কাজকে বেআইনি ঘোষণা: হাইকোর্ট বিভাগ সরকারি কর্মচারী বা কর্তৃপক্ষের কোন কার্যক্রম কেবানী ঘোষণা করতে পারে।

ঞ) বিভিন্ন রিট জারির ক্ষমতা: 

১) হাইকোর্ট বিভাগ বিভিন্ন প্রকারের রিট জারি করতে পারে। যেমন- অন্যায় ভাবে আটক কোন ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করতে আটককারীকে আদেশ দিতে পারেন। 


২) কোন ব্যক্তি কোন আইনগত পথ অবৈধভাবে দখল করলে উক্ত পথ দখলের কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিতে পারেন।

৩) হাইকোর্ট বিভাগ তার অধীনস্থ আদালতকে মামলার নথিপত্র সুবিবেচনার আদেশ দিতে পারেন।

৪) হাইকোর্ট বিভাগ তার অধীনস্থ আদালত সমূহকে কোন এখতিয়ার বহির্ভূত কাজ করা থেকে বিরত থাকার আদেশ দিতে পারেন।

৫) হাইকোর্ট বিভাগ তার অধীনস্থ আদালত ট্রাইবুনাল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তাদের আইনগত দায়িত্ব পালন করতে হুকুম জারি করতে পারেন। 



দুই আপিল বিভাগের ক্ষমতা ( আদি ক্ষেত্র) ও কার্যাবলী: 
আপিল বিভাগের কোন আদি ক্ষমতা নেই। ওর সব এখানে প্রথমে কোন মামলা করা যায় না। বাংলাদেশের সংবিধানে আপিল বিভাগের চার ধরনের এখতিয়ার আছে। নিম্নত আলোচনা করা হলো।

১) আপিল এখতিয়ার: শুধু মাত্র হাইকোর্ট বিভাগের রায় বিক্রি ও আদেশ বা দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করা যায়। 
অন্য কোন আদালতের রায় ডিগ্রী আদেশ বা দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির ক্ষমতা সংবিধান আপিল বিভাগকে দেয়নি। দুইভাবে আপিল বিভাগে আপিল করা যায়। 
ক) অধিকার বলে, খ) আপিল বিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে।

ক) অধিকার বলে: অধিকার বলে তিনটি ক্ষেত্রে আপিল বিভাগে আপিল করা যাবে।
১) হাইকোর্ট বিভাগ যদি কোন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে,
২) হাইকোর্টের অবমাননার জন্য হাইকোর্ট যদি কাউকে দন্ড প্রদান করে, 
৩) হাইকোর্টে যদি সংবিধান ব্যাখ্যার বিষয়ে আইনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত মর্মে সার্টিফিকেট প্রদান করে।

খ) আপিল বিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে: উপরের তিনটি বিষয় ব্যতীত অন্য যেকোনো দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে আপিল করা যাবে।


২) পারোনা জারির এখতিয়ার: 

সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারাধীন কোন বিষয় সম্পূর্ণ ন্যায় বিচারের স্বার্থে আপিল বিভাগ যে কোন আদেশ বা নির্দেশ জারি করতে পারে। এটি আদালতের ইচ্ছা দিন ক্ষমতা। এটি আপিল বিভাগ সব প্রণোদিত হয়ে করতে পারে আবার কারো আবেদনের প্রেক্ষিতেও করতে পারে।

৩) পুনর্বিবেচনার অধিকার: সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দুটি শর্তে আপিল বিভাগ তার নিজের ভূষিত রায় বা আদেশ পুনর্বিবেচনা করতে পারে। 
শর্ত১: সংসদ কর্তৃক প্রণীত কোন আইনের বিধান সাপেক্ষে,
শর্ত দুই: আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রণীত কোন বিধান সাপেক্ষে

৪) উপদেষ্টা মূলক এখতিয়ার: সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি যদি কখনো কোন জন ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সুপ্রিম কোর্টের মতামত নেয়ার প্রয়োজন মনে করেন তাহলে তিনি প্রশ্নটি আপিল বিভাগে বিবেচনার জন্য পাঠাতে পারেন। এক্ষেত্রে আপিল বিভাগ মতামত প্রদানের বাধ্য নয়। আপিল বিভাগ মতামত দিতেও পারে আবার মতামত দিতে অস্বীকৃতি করতে পারে। যে তদ্রুপ আপিল বিভাগ মতামত প্রদান করলে রাষ্ট্রপতি ও মানতে বাধ্য নন। তিনি মানতেও পারেন আবার মানতে নাও পারেন।



৬.৩।  হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগের বিচারক নিয়োগ কিভাবে করা যায়? / সুপ্রিম কোর্টের ( হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ) বিচারকদের নিয়োগ পদ্ধতি।



ইমনে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ বিচারকদের নিয়োগ পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো:

সংবিধানের ৯৫ দুই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ বিচারক পদে নিয়োগ লাভের জন্য কোন ব্যক্তিকে - 
১) বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে,
৩) সুপ্রিম কোর্টে কমপক্ষে ১০ বছর অ্যাডভোকেট হিসেবে থাকতে হবে, অথবা
৩) কোন বিচার বিভাগীয় কাজে কমপক্ষে ১০ বছর অধিষ্ট থাকতে হবে। 
৪) সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পদে নিয়োগ লাভের জন্য আইন দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য যোগ্যতা থাকতে হবে। 

বাংলাদেশ সংবিধানের ৯৫-২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন। প্রধান বিচারপতির সাথে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়োগ নিয়োগ করবেন।


৬.৪ ।   বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলতে কি বুঝ?


সরকারের প্রধান বিভাগ তিনটি ‌‌। শাসন বিভাগ আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। এই বিভাগগুলি একটি আরেকটি নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য এই বিভাগগুলি একে অন্যের থেকে প্রভাব মুক্ত থাকা উচিত। 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: 
সরকারের শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগের প্রভাব মুক্ত থেকে বিচারকার্য পরিচালনাকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলে। তিন ধরনের স্বাধীনতা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হিসেবে গণ্য হয়। 

১) ব্যক্তিগত স্বাধীনতা: বিচারকদের বিচারিক কাজ, তাদের সুযোগ-সুবিধা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না এটি হলো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। 

২)  সমষ্টিগত স্বাধীনতা: বিচার বিভাগের সকল ব্যবস্থাপনা যেমন: কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও অপসারণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ি সরকারের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত থাকাকে সমষ্টিগত স্বাধীনতা বলে।

৩) নৈতিক স্বাধীনতা: যেকোনো ধরনের প্রলোভন, বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি দ্বারা বিচারক কর্মকর্তাদের প্রভাবিত না করে তাদেরকে সুবিবেচনার উপর বিচার কার্য পরিচালনা করতে দেওয়াকে নৈতিক স্বাধীনতা বলে।

 

৬.৫।   বাংলাদেশের বিচার বিভাগ কি স্বাধীন? /  বিচার সংক্রান্ত কার্যসম্পাদনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা কতটা স্বাধীন? / আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গুরুত্ব আলোচনা কর। 

১৯৭২ সালের সংবিধান হলো বাংলাদেশের মূল সংবিধান। উক্ত সংবিধানে বিধান রাখা হয় প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন। প্রধান বিচারপতির সাথে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়োগ করবেন।
কিন্তু 1975 সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে প্রধান বিচারপতির পরামর্শের বিধানটি বাদ দেয়া হয়। 

পৃথিবীর সকল দেশের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির পরামর্শ গ্রহণ করা হয়। কারণ রাষ্ট্রপতি বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সম্পর্কে খুব বেশি অবহিত থাকেন না। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীতে পুনরায় প্রধান বিচারপতির পরামর্শের বিধানটি যুক্ত করা হয়।

চতুর্দশ সংশোধনী অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরে যাওয়ার বয়স ৬৭ বছর নির্ধারণ করা হয়। বিচারপতি থাকা অবস্থায় তাকে দুইভাবে অপসারণ করা যাবে। এক শারীরিক বা মানসিক দায়িত্ব পালনে অসমাপ্ত হলে। দুই গুরুতর অসাধার আচরণের জন্য দায়ী হলে।  

পূর্বে আইন ও শাসন বিভাগ বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করতো। যার ফলে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারত না। মাজদার হোসেন মামলার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। 




৬.৬।   মাসদার হোসেন বনাম বাংলাদেশ মামলা ১৯৯৯ এর সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন কর। 
বিভিন্ন দেওয়ানী আদালতের ৪৪১ জন বিচারক ১৯৯৫ সালে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। পিটিশন নং ২৪২৪ /৯৫। এটি মাসদার হোসেন মামলা নামে পরিচিত। আবেদনকারী বিচারকদের যুক্তি ছিল- 
১। জুডিশিয়াল সার্ভিসকে ১৯৮০ সালের সিভিল সার্ভিস আদেশের অধীনে অন্তর্ভুক্তিকরণ সংবিধান বহির্ভূত।
২। অধীনস্থ আদালতের বিচারকগণ বিচারক থাকা অবস্থায় কোন ট্রাইব্যুনালের অধীন হতে পারেন না। 
৩। সংবিধান দ্বারাই অধীনস্থ আদালতকে পৃথক করা হয়েছে। শুধু ১১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারবিভাগ পৃথকীকরণ কার্যকর করা অত্যাবশক। 

হাইকোর্ট বিভাগ ১৯ ৯৭ সালের রায় প্রদান করে। সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ১৯৯৯ সালে প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে ১২টি নির্দেশনা দিয়ে রায় প্রদান করা হয়। সংক্ষিপ্ত আকারে উক্ত রায় নিম্নে উল্লেখ করা হলো: 

১) বিচার বিভাগীয় চাকুরীকে নির্বাহী ও প্রশাসনিক চাকরির সাথে মিলিয়ে ফেলা বা বিলুপ করা বা প্রতিস্থাপন করা যাবে না।

২) রাষ্ট্রপতি বিচারক ও বিচার বিভাগীয় কাজে নিয়োজিত ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য স্বতন্ত্র জুডিশিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করবেন।

৩) অন্যান্য নির্বাহী ও প্রশাসনিক ক্যাডারের পাশাপাশি বিসিএস (বিচার) ক্যাডার সৃষ্টি করা সংবিধান বিরোধী।
৪) বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস নামে স্বতন্ত্র সার্ভিস করতে হবে।
৫) বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের চাকুরীর বিভিন্ন শর্তাবলী সম্পর্কে সরকারকে আইন করতে হবে।
৬) বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক পে কমিশন গঠনের জন্য সরকারকে নির্দেশ দেয়া হলো। 
৭) বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা বিচারিক কাজে নিয়োজিত ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত নির্বাহী বিভাগের উপর স্থান পাবে। 

৮) সংসদ ও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
৯) সুপ্রিম কোর্টের বাজেটে  বরাদ্দকৃত অর্থ খরচের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের অনুমোদন লাগবে না।
১০) জুডিশিয়াল সার্ভিস এর সদস্যরা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের আওতাভুক্ত থাকবেন।
১১) নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করার জন্য সংবিধানে কোন সংশোধনের প্রয়োজন নেই।
১২) অন্যদের বেতন বৃদ্ধি পেলে বিচারকদের বেতন ও বৃদ্ধি পাবে।


৬.৭।  রীট বলতে কি বুঝ? 


রীট শব্দের মূল অর্থ হল রাজাজ্ঞা বা রাজার আদেশ। বৃটেনে এর উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে। বৃটেনের রাজা বা রানী যে দলিল দ্বারা কোন ব্যক্তিকে কোন কাজ করার জন্য অথবা কোন কাজ না করার জন্য আদেশ দিতেন তাই ছিল রীট। 


রীট কাকে বলে:   define writ :
বাংলাদেশের সংবিধানে ১০২ অনুচ্ছেদে রীট ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশ হাইকোর্ট বিভাগ এই এখতিয়ার প্রয়োগ করে। 
রীট হল আদালত বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ দ্বারা ঘোষিত আদেশ। রীট নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতার রক্ষা কবচ। অর্থাৎ নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হলে তা বলবধ করার জন্য উচ্চ আদালত যে নির্দেশ প্রদান করে তাই হল রীট।



৬.৮ ।    রীট পিটিশানের পূর্ব শর্তগুলি কি কি? / কেন বলার হয়ে থাকে যে, বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদকে বিভিন্ন প্রকার রীটের নাম উল্লেখ না হলেও প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিজের প্রকৃত উপাদান বিশেষভাবে ধারণকৃত, বাক্যসমূহের বর্ণিত হয়েছে।  / বিভিন্ন প্রকার রীটের বর্ণনা দাও। / সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদে রীটের শর্তাবলী পাওয়া যায়, তবে এটি ১০২ অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়, ব্যাখ্যা কর।


রীট পাঁচ প্রকার। যথআ-

১) হ্যাবিয়াস কার্পাস বা বন্দী প্রদর্শন রীট
২) ম্যান্ডামাস বা পরমাদেশ বা হুকুম জারির রিট
৩) প্রহিবিশন বা নিষেধাজ্ঞা মূলক রিট
৪) সার্শিয়োরারি বা উৎপ্রেষণমূলক রিট
৫) কয়োওয়ারেন্টো বা কারণ দর্শাও রিট


বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বিভিন্ন ধরনের রীটের উল্লেখ না করলেও সবগুলো রীটের উপাদানই পরোক্ষভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। নিম্নে সেগুলি উল্লেখ করা হলো: 

বিভিন্ন প্রকার রীট পিটিশানের শর্ত বা বিভিন্ন প্রকার রীটের বৈশিষ্ট্য:


১) হ্যাবিয়াস কার্পাস বা বন্দী প্রদর্শন রীট:
হ্যাবিয়াস কার্পাস শব্দটি ল্যাটিন শব্দ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ স্বশরীরে হাজির করা। (To have the body before the court)।
হাইকোর্ট অন্যায় ভাবে আটক বা কারারুদ্ধ ব্যক্তিকে বিচারের জন্য আদালতে হাজির করতে আটককারীকে যে আদেশ দেন তাকেই হ্যাভিয়াস কার্পাস বা বন্দী প্রদর্শন রীট বলে।

এই নির জারি করে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জানতে চান কেন আটকৃত ব্যক্তিকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে? উক্ত কর্তৃপক্ষ যদি যথাযথ কারণ দশতে না পারে তাহলে হাইকোর্ট আপেক্ষকৃত ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিক মুক্তির জন্য আদেশ দেন। আর যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে পারে তাহলে হাইকোর্ট আটক ব্যক্তির দ্রুত বিচারের জন্য আদেশ দেন। 



২) ম্যান্ডামাস বা পরমাদেশ বা হুকুম জারির রিট: 
ম্যান্ডামাস একটি ল্যাটিন শব্দ। এর অর্থ আমরা হুকুম করেছি। কোন অধনস্থ আদালত, ট্রাইবুনাল, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি তার আইনগত দায়িত্ব পালনে ও স্বীকৃতির জানায় বা ব্যর্থ হয় তাহলে উচ্চ আদালত যে আদেশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদালত ট্রাইমুনাল, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে উক্ত আইনগত দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য করে তাকে ম্যান্ডামাস বা পরমাদেশ বা হুকুমজারির রীট বলে।

৩) প্রহিবিশন বা নিষেধাজ্ঞা মূলক রিট:
উচ্চ আদালত অধঃস্থ আদালত সমূহকে কোন এখতিয়ার বহির্ভূত কাজ করা থেকে বিরত থাকার জন্য যে রিট জারি করেন তাকে প্রহিবিশন বা নিষেধাজ্ঞা মূলক রূপ বলে। 

৪) সার্শিয়োরারি বা উৎপ্রেষণমূলক রিট:

সার্শিয়োরারি একটি লেগুন শব্দ এর অর্থ বিশেষভাবে জ্ঞাত হওয়া। উচ্চ আদালত অধঃস্থ আদালতকে মামলার নথি সুবিবেচনার আদেশ দিলে অর্থাৎ সুবিচারের জন্য পুনর্বিবেচনার আদেশ দিলে তাকে সার্শিয়োরারি বা উৎপেষণামূলক রিট বলে। 

৫) কয়োওয়ারেন্টো বা কারণ দর্শাও রিট: 

কয়োওয়ারেন্টো অর্থ কোন অধিকারের। (By what authority) । কোন ব্যক্তি যদি অবৈধভাবে সংবিধান বা আইন দ্বারা সৃষ্ট কোন সরকারি পদ দখল করে তাহলে উচ্চ আদালত যে আদেশের মাধ্যমে সেই ব্যক্তিকে উচ্চ পথ দখলের কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন তাকে কয়োওয়ারেন্টো বা কারণ দর্শানোর রীট বলে। এই রিটের মাধ্যমে উচ্চ আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবির আইনগত দিক অনুসন্ধান করে। দাবি বা দখল যদি অবৈধ প্রমাণিত হয় তাহলে আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পদচ্যুত করার ব্যবস্থা করেন।



৬.৯।  কে রীটের জন্য আবেদন করতে পারে?

উচ্চ আদালত নিজের ইচ্ছায় রীট জারি করতে পারেন না। কোন একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই উচ্চ আদালতে রীট জারির জন্য আবেদন করতে হয়।

আবার ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৯১ ধারায় উচ্চ আদালতকে হেভিয়াস কার্পাস রীট জারির ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এটি উচ্চ আদালতের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ এর বিভিন্ন অংশে কে রিট আবেদন করতে পারে তা উল্লেখিত হয়েছে। যেমন:
১) কোন ব্যক্তির মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে তা বলবৎ করার জন্য সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত অধিকার বলে উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে। এবং বাদীর অভিযোগ প্রমাণিত হলে উচ্চ আদালত যথোপযুক্ত প্রতিকারের জন্য রীট জারি করতে পারবে।

২) ম্যান্ডামাস , প্রহিবিশন ও সার্শিয়োরারি রীটের জন্য কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মামলা করতে পারবে।

৩) হ্যাবিয়াস কার্পাস ও কয়োওয়ারেন্টো রিটের জন্য যে কেউ মামলা করতে পারে।
 
৬.১০।  কাদের বিরুদ্ধে রীট আবেদন করা যায় না? /  রীটের সীমাবদ্ধতা কি?

১) মৌলিক অধিকার বলবৎ করার জন্য উচ্চ আদালতে যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে রীট জারি করতে পারে। তবে নিম্নলিখিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রীট জারি করা যাবে না।

১) বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কর্ম বিভাগসমূহ।

২) সংবিধানের ১১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গঠিত কোনো প্রশাসনিক ট্রাইবুনাল।
৩) সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ যেসব ক্ষেত্র প্রযোজ্য হয় সেসব ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকার বলবদ করার জন্য উচ্চ আদালত রীট জারি করতে পারবে না।

৪) সংক্ষুব্ধ না হলে ম্যান্ডামাস , প্রহিবিশন ও কয়োওয়ারেন্টো রিটের জন্য মামলা করতে পারবে না। 

৫) উন্নয়ন কর্মসূচি, উন্নয়নমূলক কাজ ও জনস্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকর হলে রীট জারির আদেশ করা যায় না।

উপসংহার: রীট জনগণের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। আইনগতভাবে কোন প্রতিকার পাওয়া না গেলে রিটের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়া যায়। অন্যভাবে বলা যায় আইনসঙ্গত ভাবে যদি কেউ কোন অধিকার হারায় তাহলে তার প্রতিকার হিসেবে রীট কাজ করে।

No comments:

Post a Comment