৩.১. তালাক কাকে বলে?
৩.২. মুসলিম আইনের বিধান মোতাবেক তালাক কত প্রকার ও কি কি?
৩.৩ ১৯৩৯ সনের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী নিষ্ঠুরতা বলতে কি বুঝায়? আলোচনা কর।
৩.৪ ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন পাশের প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য কি ছিল?
৩.৫ ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুসারে একজন মুসলিম মহিলা যে সকল কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারে। / কোন ক্ষেত্রে স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিগ্রি পেতে হকদার।
৩.৬ তুমি কি মনে কর ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনটি একজন মুসলিম মহিলার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ আলোচনা কর?
৩.৭. ভরণপোষণ বা নাফাকা বলতে কি বুঝ?
৩.৮. যে স্ত্রী স্বামীর নিকট হতে পৃথক বসবাস করে তার ভরণ-পোষণ দিতে স্বামী কি বাধ্য ? / স্বামী কোথায় ভরণপোষণের বাধ্যবাধকতা নীতি কি?
৩.৯. একজন তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী কর্তৃক পূর্বের স্বামীর নিকট হইতে ভরণপোষণ দাবি করতে পারে ?
৩.১০. ইদ্দত অতিক্রান্ত হওয়ার পর স্ত্রী ভরণপোষণ দাবি করতে পারে কি?
৩.১১ স্বামী কর্তৃক ভরণ পোষণ না দেয়ার ক্ষেত্রে স্ত্রীর আইনগত কি কি ব্যবস্থা নিতে পারে?
৩.১২ একজন অবাধ্য স্ত্রী কি ভরণ পোষণ পাওয়ার অধিকারী?
৩.১৩ নাবালক সন্তানাদি, স্ত্রী ও পিতা মাতার ভরণ পোষণ সম্পর্কে বিধানবলী আলোচনা কর।
৬.৩. কখন তালাক প্রত্যাহার করা যায় না?
৩.১. তালাক কাকে বলে?
তালাক আরবি শব্দ। এর অর্থ খুলে ফেলা বা মুক্ত করে দেয়া, পরিত্যাগ করা বা বিচ্ছিন্ন করা।
স্বামীর ইচ্ছা অনুসারে স্ত্রীর সাথে বিবাহ বন্ধনকে বিচ্ছিন্ন করা কে তালাক বলে। অন্যভাবে বলা যায়, কোন স্বামী কর্তৃক তার স্ত্রীকে বিবাহ বন্ধন থেকে মুক্ত করে দেওয়াকে তালাক বলে।
৩.২. মুসলিম আইনের বিধান মোতাবেক তালাক কত প্রকার ও কি কি?
তালাকের প্রকারভেদ
তালাক আরবি শব্দ এর অর্থ পরিত্যাগ করা বা বিচ্ছিন্ন করা। অর্থাৎ স্বামীর ইচ্ছা অনুসারে বিবাহবন্ধন কে বিচ্ছিন্ন করা কে তালাক বলে। নিম্নে বিভিন্ন প্রকার তালাক উল্লেখ করা হলো:
১) প্রত্যহার যোগ্য বা রাজি তালাক: যে তালাক প্রত্যাহার করা যায় তাকে প্রত্যাহার যোগ্য বা রাজি তালাক বলে।
২) অপ্রত্যাহারযোগ্য বা বাইন তালাক:
যে তালাক প্রত্যাহার করা যায় না তাকে অপ্রত্যাহারযোগ্য বা বাইন তালাক বলে।
৩) তালাইক-ই-তাউফিজ : স্বামী নিজে তালাক দিতে পারে অথবা এই ক্ষমতা যদি তার স্ত্রীকে বা অন্য কোন ব্যক্তিকে প্রদান করে তাহলে সেই ক্ষমতা অর্পণ করাকে তালাক ই তাউফিজ বলে।
৪) খুলা তালাক : যদি কোন স্ত্রী তার স্বামীকে এই মর্মে প্রস্তাব প্রদান করে যে, বৈবাহিক অবস্থা থেকে মুক্তি প্রদান করলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, সেই ক্ষেত্রে স্বামী যদি উক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করে তাহলে তাকে খুলা তালাক বলে। যেমন- দেনমোহর থেকে স্বামীকে মুক্ত করে দেওয়া বা অন্য কোন অধিকার ছেড়ে দেওয়া বা নগদ অর্থ প্রদান করা ইত্যাদি। স্ত্রী এইরূপ ক্ষতিপূরণ না দিলেও তালাক হবে তবে স্বামী ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য মামলা দায়ের করতে পারবে।
৫) মুবারাত তালাক: যে ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী উভয়ের পক্ষ থেকে বা পারস্পরিক সম্মতিতে বৈবাহিক অবস্থার বিচ্ছেদ ঘটানো হয় তাকে মুবারাত তালাক বলে। এই ক্ষেত্রে যেকোনো একজনের পক্ষ থেকে প্রস্তাব উত্থাপিত হতে পারে। এবং অন্যজন তারা গ্রহণ করতে পারে।
৬) তালাক-ই-আহসান: স্ত্রীর 'তুহর' অবস্থায় ( শরীর পবিত্র থাকা অবস্থায়) যদি কোন স্বামী এক তালাক উচ্চারণ করে এবং স্ত্রীর তিনটি ঋতুকাল পর্যন্ত তার সাথে সহবাস না করে তাহলে তাকে তালাক ই আহসান বলে। স্ত্রীর এক ঋতুকাল থেকে আরেক ঋতুকলের মধ্যবর্তী পবিত্র সময়কে 'তুহর' বলে।
৭) তালাক ই হাসান: স্ত্রীর তিনটি তুহর অবস্থায় একবার করে তালাক উচ্চারণ করলে এবং এই সময়গুলিতে সহবাস না করলে তাকে তালাক ই হাসান বলে।
৩.৩ ১৯৩৯ সনের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী নিষ্ঠুরতা বলতে কি বুঝায়? আলোচনা কর।
ইসলামী আইনে নিষ্ঠুরতা নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই।
১৯ ৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন পর্যালোচনা করে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে নিষ্ঠুরতা বলা যায়।
১) অভ্যাসগতভাবে স্ত্রীকে দৈহিকভাবে নির্যাতন করলে
২) অন্যায় ভাবে স্ত্রীর জীবন অতিষ্ঠ করলে
৩) স্বামী কলঙ্কিত জীবন যাপন করলে
৪) স্বামী অসৎ নারীদের সাথে মেলামেশা করলে
৫) স্ত্রীকে অসামাজিক জীবন যাপনে বাধ্য করলে
৬) স্ত্রীর বৈধ অধিকার প্রয়োগে বাধা দান করলে
৭) স্ত্রীর ধর্মীয় কাজে বাধা দান করলে
৮) একাধিক স্ত্রী থাকলে ইসলামী বিধান অনুযায়ী তাদের সাথে সমান আচরণ না করলে।
বিবাহ যেমন ইসলামের একটি বিধান, বিছেদো ইসলামেরই একটি বিধান । একজন স্বামী যেমন তার স্ত্রী বিভিন্ন ত্রুটির কারণে তালাক প্রদান করতে পারেন।
৩.৪ ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন পাশের প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য কি ছিল?
বিবাহ বিচ্ছেদ আইন প্রণয়নের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিবাহিত মহিলাদের বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা সম্পর্কে ইসলামী আইনের বিধানের ব্যাখ্যা প্রদান করা। এছাড়া কোন বিবাহিত মহিলা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করলে তার ফলাফল বা পরিনিতি কি তা নির্ধারণ করা ও এই আইন প্রণয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য ।
১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের খসড়া বলা হয়েছে-
কোন মুসলিম মহিলাকে তার স্বামী ভরণ পোষণ না দিলে বা ভরণ পোষণ প্রদানে অবহেলা করলে, স্ত্রীর কোন বিহিত ব্যবস্থা না করে পলাতক থাকলে, নিষ্ঠুর আচরণ করলে উক্ত স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি হাসিল করতে পারে মর্মে কোন বিধান হানাফি আইনে উল্লেখিত হয়নি। যার ফলে ব্রিটিশ ভারতে অসংখ্য মুসলিম মহিলা অবর্ণীয় দুর্দশা পতিত হন। যেহেতু মুসলিম মহিলাদের বিবাহ বিচ্ছেদের কোন ক্ষমতা বা অধিকার ছিল না সেহেতু তারা নানা বঞ্চনার শিকার হলেও বা নির্যাতিত হলেও তা মেনে নিতে বাধ্য হতো । মুসলিম মহিলাগণ যেহেতু তালাক প্রদান করতে পারত না সেহেতু তারা স্বামীর বা স্বামীর পরিবারের অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করেও তেমন কোন প্রতিকার পেতেন না। মুসলিম নারীরা লেখাপড়া বা শিক্ষা দীক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই নিজ পরিবারের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলেন। পিতা মাতা বা অভিভাবকদের মতের বাইরে যাওয়ার তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত সঠিক না হলেও তারা তা মেনে নিতে বাধ্য হত। আর একবার বিবাহ সম্পন্ন হলে সেই স্বামী যতই অযোগ্য বা মন্দ চরিত্রের হোক তাকে পরিত্যাগ করার উপায় ছিল না বা হানাফী আইনে নেই। এই সকল অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যই মূলত বিবাহ বিচ্ছেদ আইন প্রণয়ন করা হয়।
৩.৫ ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুসারে একজন মুসলিম মহিলা যে সকল কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারে। / কোন ক্ষেত্রে স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিগ্রি পেতে হকদার।
১) স্বামীর দীর্ঘ অনুপস্থিতি: স্বামী যদি চার বছর যাবত অজ্ঞাত থাকেন তাহলেই স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা দায়ের করতে পারেন। তবে মামলা দায়েরের ছয় মাসের মধ্যে স্বামী যদি উপস্থিত হন বা তার প্রতিনিধি উপস্থিত হয়ে আদালতকে সন্তুষ্ট করতে পারে তাহলে উক্ত আমরা কার্যকর হবে না।
২) ভরণপোষণ না দিলে বা ব্যর্থ হল: স্বামী যদি দুই বছর বোনতো স্ত্রী ভরণপোষণ না দেন বা অবহেলা করেন তাহলে স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা দায়ের করতে পারেন।
৩) স্বামীর মস্তিষ্ক বিকৃত হলে: স্বামী যদি দুই বছর পর্যন্ত মস্তিষ্ক বিকৃত অবস্থায় থাকে তাহলে স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা দায়ের করতে পারেন
৪) স্ত্রী নাবালিকা হলে: কোন নাবালিকার বিবাহ সম্পন্ন হলে এসে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা দায়ের করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে বিবাহের পর যৌন সহবাস করতে পারবে না এবং নাবালিকা থাকা অবস্থায় তাকে বিবাহ অস্বীকার করতে হবে যদি জনসভা হয়ে যায় তাহলে মামলা দায়ের করা যাবে না।
৫) স্বামীর নিষ্ঠুর আচরণ: স্বামী যদি শারীরিক বা মানসিকভাবে স্ত্রীকে নিষ্ঠুর যাতনা দেন তাহলেই স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা দায়ের করতে পারেন।
৬) স্বামী দীর্ঘদিনের কারাদণ্ড হলে: স্বামীর যদি সাত বছর বা তার বেশি সময়ের কারাদণ্ড হয় তাহলে স্ত্রী ইচ্ছা করলে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা দায়ের করতে পারবেন।
৩.৬ তুমি কি মনে কর ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনটি একজন মুসলিম মহিলার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ আলোচনা কর?
৩.৭. ভরণপোষণ বা নাফাকা বলতে কি বুঝ?
নাফাকা শব্দের অর্থ ভরণ পোষণ। ইংরেজিতে Maintenance. সাধারণত খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, এই তিনটি জিনিসের অধিকার কে নাফাকা বা ভরণ-পোষণ বলে।
মানুষ তার আপনজন বা পরিবার-পরিজনের জন্য যা ব্যয় করে বা ব্যয় করতে বাধ্য তাই হল নাফাকা বা ভরণ পোষণ।
ভরণ পোষণ / খোরপোষ ( নাফাকা ) :
ভরণপোষণের নির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। সাধারণত নাফাকা বা ভরণপোষণ বলতে, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এই তিনটি জিনিস বুঝালেও ভরণ পোষণ শুধুমাত্র এই তিনটি জিনিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এক একজনের ভরণ পোষণ এক এক ধরনের হতে পারে। ভরণপোষণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান, তার প্রয়োজন ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়। যেমন- একজন শিশু শিক্ষার্থীর ভরণপোষণের মধ্যে তার লেখাপড়ার খরচ অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু একজন পিতা বা দাদার ভরণপোষণের মধ্যে লেখাপড়ার খরচ অন্তর্ভুক্ত হবে না। সুতরাং বলা যায়- মানুষ তার আপনজন বা পরিবার-পরিজনের জন্য যা ব্যয় করতে আইনত বাধ্য তাকে নাফাকা বা ভরণপোষণ বলে।
৩.৮. যে স্ত্রী স্বামীর নিকট হতে পৃথক বসবাস করে তার ভরণ-পোষণ দিতে স্বামী কি বাধ্য ? / স্বামী কোথায় ভরণপোষণের বাধ্যবাধকতা নীতি কি?
যে স্ত্রী স্বামীর নিকট হতে পৃথক বসবাস করে তার ভরণপোষণ দিতে কি স্বামী বাধ্য:
স্ত্রী যতদিন স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে, স্বামীর যুক্তিসঙ্গত আদেশ মেনে চলবে ততদিন স্বামী তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু স্ত্রী যদি অন্যায় ভাবে স্বামীর অবাধ্য হয়, বিনা কারণে যৌন সঙ্গমে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে স্বামী তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবে না।
কিন্তু স্বামী যদি তার স্ত্রীর অবিলম্বে পরিশোধযোগ্য মোহর পরিষদ না করে বা যুক্তিসঙ্গত কারণে অবাধ্য হয় বা যৌনসঙ্গম করতে না চায় বা নিষ্ঠুর আচরণের ফলে অন্যত্র বসবাস করতে বাধ্য হয় তাহলে উক্ত স্বামী তার স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবে।
এছাড়াও কোন স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে এই মর্মে চুক্তি করে যে, তাকে তার পিতার বাড়ি বসবাস করতে দিবে তাহলে ওই স্ত্রী পিতার বাড়ির অবস্থান করলেও ভরণ পোষণ পাবেন। পরিশেষে বলা যায় যুক্তিসঙ্গত কারণে কোন স্ত্রী তার স্বামীর নিকট থেকে পৃথক বসবাস করলে ওই স্বামী ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবে। আর যুক্তিসঙ্গত কারণ না থাকলে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবে না।
৩.৯ কোন ব্যক্তি কি অতীত সময়ের জন্য ভরণপোষণ দাবি করতে পারে? / একজন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী কিভাবে পূর্বের স্বামীর নিকট থেকে ভরণপোষণ দাবি করতে পারে?
কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতীত সময়ের জন্য ভরণপোষণ দাবি করা যায়। যেমন- কোন স্ত্রীকে তালাক দেওয়া হলে তার ইদ্দতের সময়কাল পর্যন্ত তিনি ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন।
কিন্তু ইদ্দতের সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও যদি স্ত্রীকে তালাকের সংবাদ জানানো না হয় তাহলে যতদিন ওই স্ত্রী তালাকের সংবাদ না পাবেন ততদিন ভরণ বসুন দাবি করতে পারবেন। এই ক্ষেত্রে অতীত সময়ের জন্য ভরণ পোষণ এর দাবি করা যায়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রোলিং অনুযায়ী অতীত ভরণপোষণের কোন লিখিত চুক্তি না থাকলেও হানাফী মাযহাবভুক্ত স্ত্রী তার স্বামীর নিকট থেকে অতীত ভরণ পোষণ পাবে। এছাড়া সন্তান তার পিতার নিকট থেকে অধিক সময়ের ভরণপোষণ পাবে।
৩.১০. ইদ্দত অতিক্রান্ত হওয়ার পর স্ত্রী ভরণপোষণ দাবি করতে পারে কি?
একজন পুরুষ এবং একজন নারী যতদিন বৈধ স্বামী স্ত্রী হিসেবে বসবাস করবেন ততদিন স্ত্রী ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারীনী হবেন। অর্থাৎ স্ত্রী যতদিন স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে, স্বামীর যুক্তিসঙ্গত আদেশ মেনে চলবে ততদিন স্বামী তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু স্ত্রী যদি অন্যায় ভাবে স্বামীর অবাধ্য হয়, বিনা কারণে যৌন সঙ্গমে অস্বীকৃতি জানায় অথবা বিবাহ বিচ্ছেদের পর স্ত্রীর ইদ্দতকাল অতিক্রান্ত হয়ে যায় তাহলে স্বামী তার ভরণ পোষণ দিতে বাধ্য থাকবে না। এই প্রসঙ্গে হাফিজুর রহমান বনাম শামসুন্নাহারের মামলা উল্লেখ করা যায়-
এই মামলার বাদিনীর নাম শামসুন্নাহার বেগম।
বাড়ি কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানায়।
১৯৮৮ সালে শামসুন্নাহার দাউদকান্দির পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলার বিষয় ছিল- নিজের ও হেফজুর রহমানের ঔরসজাত সন্তানের ভরণপোষণ এবং দেনমোহর আদায়।
দাউদকান্দির পারিবারিক আদালত শামসুন্নাহারের পক্ষে ডিক্রি প্রদান করে। হেফজুর রহমান জর্জ কোর্টে আপিল করেন। জর্জকোর্টের রায় সন্তুষ্ট না হয়ে তিনি হাইকোর্টে আসেন। হাইকোর্টের দুইজন বিচারকের ডিভিশন বেঞ্চ দাউদকান্দির পারিবারিক আদালতের রায় ও ডিক্রি বহাল রাখেন। হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত দেন যে-
* শামসুন্নাহার তার স্বামীর নিকট থেকে সম্পূর্ণ দেনমোহর পাবেন।
* শামসুন্নাহার যতদিন দ্বিতীয় বিবাহ না করবেন এবং তাদের সন্তান সুমন যতদিন প্রাপ্তবয়স্ক না হবেন ততদিন হেফজুর রহমান এক হাজার টাকা করে ভরণ পোষণ দিবেন।
হেফজুর রহমান সুপ্রিম কোর্টের সর্বোচ্চ স্থান আপিল বিভাগে লিভ টু পিটিশন দায়ের করেন। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় খারিজ করে দেন। আপিল বিভাগ রায় দেন যে, তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দতকাল তিন মাস। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী এই সময় পর্যন্ত সে ভরণপোষণ পাবে। অর্থাৎ ইদ্দতকালীন সময় পর্যন্ত শামসুন্নাহার হেফজুর রহমানের নিকট থেকে ভরণপোষণ পাবেন। সুতরাং বলা যায় ইদ্দত অতিক্রান্ত হওয়ার পর স্ত্রীর ভরণ পোষণের দাবি করতে পারে না।
সচ্ছল ব্যক্তি ভরণ পোষণ আইন অমান্য করলে তার জন্য আইনে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি বা দন্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন পিতা-মাতার ভরণ পোষণ সম্পর্কে আইনে বলা হয়েছে, কোন সন্তান ধারা ৩ এবং ৪ লংঘন করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে এবং উক্ত অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড হবে। উক্ত অর্থদণ্ড অনাদয়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাসের কারাদণ্ড হবে।
৩.১১ স্বামী কর্তৃক ভরণ পোষণ না দেয়ার ক্ষেত্রে স্ত্রীর আইনগত কি কি ব্যবস্থা নিতে পারে?
আইনসঙ্গত কারণ ছাড়া কোন স্বামী তার স্ত্রীকে ভরণ পোষণ প্রদান না করলে উক্ত স্ত্রী নিম্নের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন:
১) বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আদালতে আবেদন:
আইনসঙ্গত কারণ ছাড়া কোন স্বামী তার স্ত্রীকে দুই বছর কাল ভরণপোষণ প্রদান না করলে ১৯৩৯ সালের মহিলা বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আদালতে আবেদন করতে পারবে এবং ডিক্রি পাবার অধিকারীনী হবেন।
২) চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন: আইন সঙ্গত কারণ ছাড়া কোন স্বামী তার স্ত্রীকে ভরণ পোষণ প্রদান না করলে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াও স্ত্রী চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করতে পারবে। চেয়ারম্যান তখন সালিশ পরিশোধ গঠন করে ভরণপোষণ হিসেবে দেয় অর্থের পরিমাণ ঠিক করে সার্টিফিকেট প্রদান করতে পারবেন।
৩) সার্টিফিকেট পুনঃবিবেচনা: স্বামী বা স্ত্রী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট ফি প্রদান করে উক্ত সার্টিফিকেট কোন বিবেচনার জন্য উপজেলা অফিসার নিকট দরখাস্ত করতে পারবেন। উক্ত অফিসার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। উক্ত অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।
৪) অর্থ আদায়: উপরোক্ত দেয় অর্থ স্বামী যদি যথাযথ সময়ে পরিশোধ না করে তাহলে বকে ভূমি রাজস্বের ন্যায় আদায় করা যাবে
৫) পারিবারিক আদালতের মামলা: ভরণ পোষণ থেকে উদ্ভূত সমস্যা নিরসনের জন্য ১৯৮৫ সালের পারিবারিক অধ্যাদেশ অনুযায়ী মামলা করা যাবে।
৩.১২ একজন অবাধ্য স্ত্রী কি ভরণ পোষণ পাওয়ার অধিকারী?
যতদিন স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে স্বামীর যুক্তিসঙ্গত আদেশ মেনে চলবে ততদিন স্বামী তার ভরণ পোষণ দিতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু স্ত্রী যদি অন্যায় ভাবে স্বামীর অবাধ্য হয় বিনা কারণে যৌন সঙ্গমে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে স্বামী তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবে না। কিন্তু স্বামী যদি তার স্ত্রীর অবিলম্বে পরিশোধযোগ্য মোহর পরিষদ না করে বা যুক্তিসঙ্গত কারণে অবাধ্য হয় বা জনসম্মান করতে না চায় বা নিষ্ঠুর আচরণের ফলে অন্যত্র বসবাস করতে বাধ্য হয় তাহলে উক্ত স্বামী তার স্ত্রীর ভরণ পোষণ দিতে বাধ্য থাকবে।
৩.১৩ মুসলিম আইন অনুযায়ী কারা অন্য ব্যক্তির নিকট ভরণপোষণ দাবি করতে পারে? অথবা নাবালক সন্তান, স্ত্রী, পিতা মাতার ভরণ পোষণের বিধান।
যারা মুসলিম আইন অনুযায়ী অন্য ব্যক্তির নিকট ভরণপোষণ দাবি করতে পারে তাদের সম্পর্কে নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১) পিতা কর্তৃক পুত্রকে ভরণ পোষণ: পুত্র সাবালক হওয়া পর্যন্ত পিতা ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবেন। পুতুল যদি বিশেষ কোনো রোগ পঙ্গু ইত্যাদি আক্রান্ত থাকে তাহলে সে সাবালক হওয়ার পরও পিতা তার ভরণপোষণ দিবেন।
২) মাতা কর্তৃক পুত্রকে ভরণ পোষণ: পিতা যদি অসামর্থ্যবান হন এবং মাথা যদি সচ্ছল হন তাহলে উপরোক্ত ক্ষেত্রে মাতা পুত্রের ভরণপোষণ দিবেন।
৩) পিতা-পতি কন্যাকে ভরণপোষণ: কন্যাদের যতদিন বিবাহ না হবে ততোদিন পিতা তার ভরণপোষণ দিবেন।
৪) মাতা কর্তৃক কন্যাকে ভরণ পোষণ: পিতা যদি অসমর্থ্যবান হন এবং মাথা যদি সচ্ছল হন তাহলে উপরোক্ত ক্ষেত্রে মাতা তার কন্যার ভরণপোষণ দিবেন।
৫) পিতার পিতা বা দাদা বা পিতামহ কর্তৃক নাতি নাতনির ভরণ পোষণ: পিতা এবং মাতা উভয়ে যদি অসমর্থ্যবান হন তাহলে উপরোক্ত সকল ক্ষেত্রে পিতার পিতা বা দাদা বা পিতামহ কর্তৃক নাতি নাতনীর ভরণপোষণ দিবেন।
৬) পুত্রকন্যা কর্তৃক পিতাকে ভরণ পোষণ: কোন পুত্রকন্যা সচ্ছল হলে যদি তার পিতা অসচ্ছল হয় তাহলে তার ভরণপোষণ দিতে উক্ত সন্তান বাধ্য।
৭) পুত্রকন্যা কর্তৃক মাতা কে ভরণ পোষণ: কোন পুত্র কন্যা সচ্ছল হলে যদি তার মাথা অসচ্ছল হয় তাহলে তার ভরণপোষণ দিতে উক্ত সন্তান বাধ্য। এক্ষেত্রে পুত্র যদি অভাবীয় হয় তবুও মাতার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।
৮) নাতী-নাতনী কর্তৃক দাদা-দাদী, নানা নানীর ভরণপোষণ: পিতা কে কোন ব্যক্তি যেমন ক্ষেত্রে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য তেমন ক্ষেত্রে অসচ্ছল দাদা-দাদী নানা-নানীর ভরণপোষণ দিতে নাতি নাতনি বাধ্য।
৯) স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে ভরণ পোষণ: স্ত্রী যতদিন স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে স্বামীর যুক্তিসঙ্গত আদেশ মেনে চলবে ততদিন স্বামী তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবে।
১০) অন্যান্য আত্মীয়দের ভরণপোষণ: সচ্ছল ব্যক্তিগণ তাদের দরিদ্র নিকট আত্মীয়দের অর্থাৎ যাদের সাথে বিবাহ হারাম এমন ব্যক্তিদের ভরণ পোষণ দিতে বাধ্য তবে কোন পিতা তার মৃত পুত্রের বিধবা স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নয়।
No comments:
Post a Comment