৯.১. সুফার (অগ্রক্রয়) সংজ্ঞা দাও।
৯.২ অগ্রক্রয়ের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য কি?
৯.৩. মুসলিম আইনে কোন কোন ব্যক্তি সুফার (অগ্রক্রয়) দাবি করতে পারে?
৯.৪. সুফার (অগ্রক্রয়) অধিকার বাস্তবায়নে কি কি শর্ত পূরণ করতে হবে এবং পদ্ধতি অথবা আনুষ্ঠানিকতা বর্ণনা কর।
৯.৫. সুফার অগ্রক্রয় আবশ্যকীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন না করার পরিণতি কি?
৯.৬. একজন মুসলিম কি হিন্দু ক্রেতার বিরুদ্ধে অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রয়োগ করতে পারে?
৯.৭.অগ্রক্রয়ের অধিকার কখন জন্মায় এবং কিভাবে তা প্রয়োগ হয়?
৯.৮. সুফা বা অগ্রক্রয়ের অধিকার বিনষ্ট হয়। / কিভাবে অগ্রক্রয়ের অধিকার বিলুপ্ত হয়?
৯.৯. তলবি মুয়াসিবাত কি? সমস্যা-
২.১০. সংলগ্ন ও বৃহৎ আকারের ভূভাগের উপর অগ্রক্রয়ের দাবি করিতে না পারার কারণ কি?
৩.১১. এ ধরনের মামলায় তামাদি বিধান কি?
৩.১২. একজন শিয়া অগ্রক্রয় দাবি করতে পারে?
৩.১৩. শিয়া ও সুন্নি আইনের মধ্যে অগ্রগরের ক্ষেত্রে তুলনা বা পার্থক্য দেখাও।
২.৩. সুফার আইনগত ও অর্থনীতি ভিত্তি কি?
৯.১. সুফার (অগ্রক্রয়) সংজ্ঞা দাও।
সুফা একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ অগ্রক্রয় আধিকার। অর্থাৎ আগে ক্রয় করার অধিকার। একে ইংরেজিতে Pre-emption বলে। সুফা হল একজনের পূর্বে আরেকজনের ক্রয় করার বিশেষ অধিকার লাভ করা। যেমন- কোন জমি ক্রয় হলে সেই জমি ক্রয় করার সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার কার? তারপরে কার অগ্রাধিকার? তারপরে কার অগ্রাধিকার? এভাবে সুফা দ্বারা অধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।
অগ্রক্রয় হয় বা সুফা কাকে বলে:
কোন স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় হলে তার মালিকানার লাভের জন্য অগ্রাধিকার লাভ করাকে অগ্রপ্রয়বাধিকার বলে।
এটি এমন এক অধিকার যা প্রয়োগ করে কোন কোন ব্যক্তি অন্যদের পূর্বে স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়ের অধিকার লাভ করেন।
বিশেষ কারণে এই অধিকার লাভ করা যায়। যেমন - বিক্রেতার ওয়ারিশ হওয়া, বিকৃত স্থাবর সম্পত্তির সুবিধা ভোগী হওয়া, বিকৃত সম্পত্তির পাশের সম্পত্তির মালিক, ইত্যাদি।
সুতরাং বলা যায় কোন স্থাবর সম্পত্তির অন্যদের পূর্বে ক্রয় করার অধিকার কেই সুফা বা অগ্রক্রয়ের অধিকার।
৯.২ অগ্রক্রয়ের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য কি?
অগ্রক্রয় হলো এমন একটি অধিকার যার মাধ্যমে কোন স্থাবর সম্পত্তি তার মালিক কর্তৃক যথাযত পন্থায় অন্য কোন ব্যক্তির নিকট বিক্রয় ও হস্তান্তরিত হওয়া স্বত্বেও যথাযথ মূল্য পরিশোধে সম্পত্তির ক্রেতা কে অগ্রক্রয়ের অধিকারী ব্যক্তির নিকট হস্তান্তর করতে বাধ্য করার অধিকার।
একই জোত জমা ভুক্ত বা ওয়ারিশী সম্পত্তি গুলো যাতে উক্ত জোত জমা ভুক্ত শরীক বা ওয়ারিশদের নিকটেই বিক্রয় করা হয় এবং সম্পত্তি গুলো যাতে ক্ষুদ্র ক্ষু্দ্র অংশে বিভক্ত না হয় বা আগন্তুক ব্যক্তির আগমনে পূর্বে থেকে বসবাসরত শরীকদের শান্তিপূর্ন বসবাসে বিঘ্ন না ঘটে এইরুপ প্রভৃতি উদ্দেশ্যেই মূলত অগ্রক্রয় অধিকার প্রথার উৎপত্তি।
৯.৩. মুসলিম আইনে কোন কোন ব্যক্তি সুফার (অগ্রক্রয়) দাবি করতে পারে?
মুসলিম আইন অনুযায়ী তিন শ্রেণীর ব্যক্তি অগ্রক্রয়ের অধিকার দাবি করতে পারে। নিম্নেতা উল্লেখ করা হলো:
১) সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির শরিকগণ প্রথমে অগ্রক্রয় দাবি করতে পারেন।
২) পথ চলার সুবিধা ভোককারী বা পানি নিষ্কাশনের সুবিধা ভোগকারী অগ্রক্রয় দাবি করতে পারেন।
৩) সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির সাথে সংলগ্ন সম্পত্তির মালিক অগ্রক্রয় দাবি করতে পারেন।
উপরের তিন শ্রেণীর মধ্যে প্রথম শ্রেণীর কেউ থাকলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর সকলের বঞ্চিত হবেন। যদি প্রথম শ্রেণীর কেউ না থাকে তাহলে দ্বিতীয় শ্রেণী তৃতীয় শ্রেণিকে বঞ্চিত করবে। আর যদি প্রথমও দ্বিতীয় শ্রেণীর কেউ না থাকে তাহলে তৃতীয় শ্রেণি অগ্রক্রয়ের অধিকার লাভ করবে।
৯.৪. সুফার (অগ্রক্রয়) অধিকার বাস্তবায়নে কি কি শর্ত পূরণ করতে হবে এবং পদ্ধতি অথবা আনুষ্ঠানিকতা বর্ণনা কর।
অগ্রক্রয়ের প্রকৃতি বা শর্ত অথবা অগ্রক্রয় এর অধিকার প্রয়োগ করার জন্য যে আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন হয় তা আলোচনা:
কোন ক্রেতার নিকট থেকে পুনরায় ক্রয়ের অধিকারকে অগ্রাধিকার বলে। অর্থাৎ একজনের চেয়ে অন্য একজনের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ক্রয় করার অধিকারকে অগ্রাধিকার বলে। অন্যভাবে বলা যায় এটি কোন সম্পত্তি ক্রয় করার বিশেষ এক ধরনের অধিকার। প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের সম্পত্তি উপভোগ করার যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি কোন সম্পত্তি বিক্রয় হলে তার মালিকানা লাভের ও বিশেষ অধিকার রয়েছে। আর এই মালিকানা লাভের বিশেষ অধিকারকে অগ্রাধিকার বলে। অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিম্নোক্ত শর্ত পূরণ করতে হয়-
১) বিকৃত সম্পত্তির মালিকের সাথে অগ্রক্রয়াধিকারী ব্যক্তির বিশেষ সম্পর্ক থাকতে হবে।
২) বিকৃত সম্পত্তি থেকে কোন বিশেষ সুযোগ-সুবিধা লাভের অধিকারী হতে হবে
৩) বিক্রিত সম্পত্তির সংলগ্নে সম্পত্তি থাকতে হবে।
৯.৫. সুফার অগ্রক্রয় আবশ্যকীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন না করার পরিণতি কি?
উপরের শর্তগুলি কোন ব্যত্যয় ঘটলে পিএম সনের দরখাস্ত অগ্রাহ্য হবে। এতকিছুর পরও ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাতন্ত্র আইনের ৯৬ এবং ১৯৫৯ সালের অকৃষি প্রজাতন্ত্র আইনের ২৪ ধারা বিধান অনুযায়ী নিম্ন বর্ণিত ক্ষেত্রে অগ্রক্রয়ের মামলা চলে না। যদি-
১) বিক্রিত জমি বসতবাড়ি হয়।
২) ক্রয়ের মামলা দায়ের করার আগে বিক্রিত জমি বিক্রেতার কাছে হস্তান্তরিত হয়।
৩) উক্ত বিক্রয় সাজোষী বা জাল বিবেচিত হয়।
৪) বিনিময় বা ভাগ বাটোয়ারা সংক্রান্ত সম্পত্তি হস্তান্তর হয়।
৫) স্বামী স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীর বরাবরে উইল বা দান মূল্যের সম্পত্তি হস্তান্তর করে।
৬) হেবা বিল এওয়াজ মূলে হস্তান্তর করলে।
৭) রক্তের সঙ্গে সম্পর্কিত তিন পুরুষের দান বা উইল মূলে হস্তান্তর করে ।
৮) মুসলিম মাইনে ওয়াকফ এবং ধর্মীয় কারণে বা দাতব্য উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত হস্তান্তরে।
৯.৬. একজন মুসলিম কি হিন্দু ক্রেতার বিরুদ্ধে অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রয়োগ করতে পারে?
একজন মুসলিম হিন্দু প্যাটের বিরুদ্ধে অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রয়োগ করতে পারে কিনা এ বিষয়ে বিভিন্ন আদালতের ভিন্ন ভিন্ন মতামত লক্ষ্য করা যায়।
যেমন- কলিকাতা হাইকোর্ট ও মুম্বাই হাইকোর্টের মতে- ক্রেতাকে মুসলমান হতে হবে।
এলাহাবাদ হাইকোর্ট ও পাটনা হাইকোর্টের মতে- ক্রেতাকে মুসলমান হওয়ার আবশ্যকতা নেই।
এছাড়া সকল আদালতের মতে, বিক্রেতা এবং অগ্রধিকারী উভয়কে মুসলমান হতে হবে । ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন এবং ১৯৪৯ সালের অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন অনুযায়ী, অবসরের অধিকার ব্যক্তিগত অধিকারের চেয়ে সম্পত্তিগত অধিকার বেশি প্রবল। কাজী ক্রেতা বা বিক্রেতায় হিন্দু কি মুসলিম তা গুরুত্বহীন।
সুতরাং বলা যায় একজন মুসলিম হিন্দু ক্রেতার বিরুদ্ধে অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
৯.৭.অগ্রক্রয়ের অধিকার কখন জন্মায় এবং কিভাবে তা প্রয়োগ হয়?
নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে অগ্রক্রয়ের অধিকার সৃষ্টি হয়-
অগ্রক্রয়ের অধিকার:
১) বৈধ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রক্রয়ের অধিকার সৃষ্টি হয়।
২) প্রকৃত বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রক্রয়ের অধিকার সৃষ্টি হয়
৩) সম্পূর্ণ অংশের উপর অগ্রক্রয়ের অধিকার সৃষ্টি হয়।
দান বা সেবা, উইল, সাদাকা, ওয়াকফ, লীজ, বন্ধক বা রেহেন, শর্তসাপেক্ষে বিক্রয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে অগ্রক্রয়ের অধিকার সৃষ্টি হয় না।
অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রয়োগ:
নিম্নে অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রয়োগের পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো-
১) দাবির জন্য বিলম্ব না করা:
ওগো কয়েক দাবীর জন্য বিক্রয় সম্পর্কে সংবাদ পাওয়ার পর বিলম্ব না করে দ্রুত অধিকার প্রয়োগ করার ইচ্ছা পোষণ করতে হবে।
২) ক্রেতা বা বিক্রেতার উপস্থিতিতে দাবি: অগ্রগয়ের জন্য উক্ত সম্পত্তির ক্রেতা বা বিক্রেতার উপস্থিতিতে দাবি করতে হবে।
৩) সাক্ষীর সামনে দাবি: কমপক্ষে দুইজন সাক্ষীর সামনে অধিকার প্রয়োগের ইচ্ছা ঘোষণা করতে হবে।
৪) মামলা দায়ের: সম্পত্তি ক্রেতা বা বিক্রেতা দাবি মেনে না নিলে আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।
৯.৮. সুফা বা অগ্রক্রয়ের অধিকার বিনষ্ট হয়। / কিভাবে অগ্রক্রয়ের অধিকার বিলুপ্ত হয়?
নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির অগ্রক্রয়ের অধিকার বিলুপ্ত হয়:
১) সম্মতি প্রদান করলে: অগ্রক্রয় আধিকারী ব্যক্তি যদি বিক্রয়ের ব্যাপারে সম্মতি প্রদান করে তাহলে অগ্রক্রয়ের অধিকার বিলুপ্ত হয়।
২) আপোস করলে: অগ্রক্রয় আধিকারী ব্যক্তি যদি কোন ক্রেতার সাথে আপোষ করে তাহলে অগ্রক্রয়ের অধিকার বিলুপ্ত হয় ।
৩) অগ্রক্রয়ের অধিকার নেই এমন ব্যক্তিকে বাদী পক্ষ ভুক্ত করলে: অগ্রক্রয়ের অধিকারী ব্যক্তি যদি তার মামলায় বাদী হিসেবে এমন ব্যক্তিকে পক্ষোভুক্ত করে যার অগ্রক্রয়ের অধিকার নেই তাহলে অধিকার বিলুপ্ত হবে এবং মুক্ত মামলা খারিজ হবে।
৪) তামাদি মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে: বাড়ি যদি তামাদি মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে মামলা দায়ের না করেন তাহলে অগ্র ক্রয়ের অধিকার বিলুপ্ত হবে।
৫) সমগ্র সম্পত্তির উপর দাবি না করলে: সম্প্রতি যদি একজন ক্রেতার নিকট বিক্রয় করা হয় তাহলে উক্ত সম্পত্তির একটি অংশ অগ্রক্রয়ের জন্য দাবি করা যাবে না । অর্থাৎ সম্পূর্ণ অংশের উপর অগ্রক্রয়ের দাবি করতে হবে। একটি অংশ অগ্রক্রয়ের জন্য দাবি করলে অগ্রক্রয়ের অধিকার বিলুপ্ত হবে।
৯.৯. তলব ই মুয়াসিবাত কি? সমস্যা-
সম্পদ বিক্রয় সংবাদ প্রাপ্তির সাথে সাথে অথবা এর অব্য বহিত পরেই অগ্রক্রয়ের দাবিদারকে অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রয়োগের ইচ্ছা ঘোষণা করতে হয়। একে বলে তলবই মুয়াসিবাত। অর্থাৎ কোন সম্পদ বিক্রয় হলে ওই সম্পদে যিনি অগ্রক্রয়ের অধিকারী তিনি দ্রুততার দাবি উপস্থাপন করবেন। বা অগ্রক্রয় ঘোষণা দিবেন। এক্ষেত্রে উক্ত দাবি উপস্থাপনের সময় কোন সাক্ষীর প্রয়োজন নেই।
মুসলিম আইনে বর্ণিত অগ্রক্রয় অধিকার সংক্রান্ত বিধান মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে প্রাধান্য লাভ করবে। এই আইনকে অন্য কোন আইন দ্বারা খর্ব করা হয়নি। যার ফলে হিন্দু ক্রেতার বিরুদ্ধেও অগ্রক্রয়ের মামলা দায়ের করা যায়। মুসলিম আইনে অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রয়োগের জন্য কিছু আনুষ্ঠানিকতা আছে। অগ্রক্রয়ের দাবিদার ব্যক্তি উক্ত আনুষ্ঠানিকতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট পদ্ধতি পালন করলে অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
No comments:
Post a Comment