১.১ । সংবিধান বলতে কি বুঝ?
১.২। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বলতে কি বুঝ?
১.৩। কেন সংবিধানকে একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন বলা হয়?
১.৪। বাংলাদেশ সংবিধানে আইন প্রণয়ন পদ্ধতি আলোচনা কর।
১.৫। আইন প্রণয়ন পদ্ধতিকে আরো কার্যকর করার জন্য তোমার পরামর্শ দাও। / আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে আরো কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক করার ক্ষেত্রে তোমার প্রস্তাব ও পরামর্শ দাও।
১.৬। অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সাংবিধান কি সংশোধন করা যায়? ব্যাখ্যা কর।
১.৭। একটি বিল কি কি পর্যায়ে অতিক্রম করে জাতীয় সংসদের আইনে পরিণত হয়? বিশ্লেষণ কর। / একটি বিল কিভাবে আইনে পরিণত হয়?
১.৮। কখন একটি অধ্যাদেশ বা বিল আইনে পরিণত হয়? / রাষ্ট্রপতি ঘোষিত কোন অধ্যাদেশ বিল আইনে পরিণত হয়?
১.৯। বাংলাদেশ সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি গুলো কি? / বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা প্রকৃতি ও পরিধি নির্ণয় কর। / জাতীয় সংসদ কি সংবিধান সংশোধন করার একক ক্ষমতার অধিকারী?
১.১০। সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানের মূল বৈশিষ্ট্য কি পরিবর্তন করা যায়? উপযুক্ত কেস লর উল্লেখপূর্বক আলোচনা কর।/ সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের মূল বৈশিষ্ট্য কি পরিবর্তন করা যায়? / সংবিধানের মৌলিক কাঠামো কি সংশোধনযোগ্য?
১.১১। আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ মামলায় কিভাবে বিচারিক পর্যালোচনা প্রয়োগ করা হয়েছিল?
১.১২। সাংবিধানিক প্রাধান্য বলতে কি বুঝ?/ সংসদীয় প্রাধান্য ও সাংবিধানিক প্রাধান্য বলতে কি বুঝ?/ জাতীয় সংসদ কি এককভাবে সংবিধান সংশোধন করতে পারে? / সংসদীয় প্রাধান্য এর উপর সাংবিধানিক প্রাধান্য স্থান পায়।
১.১ । সংবিধান বলতে কি বুঝ?
কোন রাষ্ট্র সুষ্ঠভাবে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন আইন কানুন প্রয়োজন হয়। নিয়ম-শৃঙ্খলা না থাকলে দেশ অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। প্রত্যেকটি দেশ পরিচালনার জন্য সরকার থাকে। দেশের শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ইত্যাদি দ্বারা সরকার পরিচালিত হয়। এই সকল বিভাগের কাজ বা দায়িত্ব যে বইতে লিপিবদ্ধ তাকে সংবিধান বলে।
সংবিধান কাকে বলে:
দেশের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য লিখিত বা অলিখিত নিয়ম-কানুনকে সংবিধান বলে।
সিএফ স্ট্রং এর মতে, "যে সকল নিয়মকানুন দ্বারা সরকারের ক্ষমতা শাসিত অধিকার ও শাসক শাসিতের সম্পর্ক নির্ধারিত হয় তাকে সংবিধান বলে। "
বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সংবিধান লিখিত। তবে অলিখিত সংবিধানও রয়েছে। যেমন ব্রিটিশ সংবিধান একটি অলিখিত সংবিধান।
অর্থাৎ বলা যায়- রাষ্ট্র, সরকার, জনগণ, ইত্যাদি ক্ষমতা, প্রকৃতি, সম্পর্ক, ইত্যাদি সম্বলিত লিখিত বা অলিখিত আইনকেই সংবিধান বলে।
১.২। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বলতে কি বুঝ?
একটি মানুষের যদি একটি বা দুটি হাত না থাকে তাহলে তাকে সম্পূর্ণ বলা যায় না। যদি তার একটি বা দুটি পা না থাকে তাহলে তাকে সম্পূর্ণ বলা যায় না, যদি তার একটি বা দুটি চোখ না থাকে তাহলে তাকে সম্পূর্ণ বলা যায় না। এভাবে মানুষের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ যে কোন অঙ্গ না থাকলে তাকে সম্পূর্ণ বলা যায় না। তদ্রুপ সংবিধানের কিছু বিধান আছে যা না থাকলে সংবিধানকে সম্পূর্ণ বলা যায় না।
অর্থাৎ সংবিধানের যে অংশ বা যে বিধান না থাকলে তাকে অসম্পূর্ণ সংবিধান বলে মনে হয় বা সম্পূর্ণ সংবিধান বলা যায় না সেই বিধানগুলি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো। একে সংবিধানের শরীর গঠন প্রণালীও বলা হয়।
যেমন - প্রস্তাবনা , প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, তৃতীয় ভাগ , ইত্যাদি।
১.৩। কেন সংবিধানকে একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন বলা হয়?
যেকোনো দেশের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি বা পদ্ধতি জনগণের অধিকার দায়িত্ব ও কর্তব্য বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগ সহ বিভিন্ন বিভাগের ক্ষমতা, সরকার ও বিভিন্ন বিভাগের কাঠামোসহ নানা বিষয় লিপিবদ্ধ থাকে। লিখিত হোক আরো লিখিত হোক সংবিধান ছাড়া কোন দেশ পরিচালনা সম্ভব নয়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় যেমন সংবিধান প্রয়োজন, একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় সংবিধান প্রয়োজন। সংবিধানের আইনের বিপরীত কোন আইন দেশের সর্বোচ্চ আদালতে তৈরি হতে পারে না। অর্থাৎ সংবিধানের বিপরীতে কোন আইন তৈরি করলে তা বাতিল বলে গণ্য হয়। সুতরাং বলা যায় সংবিধানিক হলো দেশের সর্বোচ্চ আইন।
১.৪। বাংলাদেশ সংবিধানে আইন প্রণয়ন পদ্ধতি আলোচনা কর।
মানুষের আচার আচরণ কার্যবিধি ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন নিয়মকানুন প্রণয়ন করাকে আইন প্রণয়ন বলে। বিভিন্নভাবে এই আইন প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। যেমন বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত বা আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, পার্লামেন্ট বা জাতীয় সংসদের মাধ্যমে, নির্বাহী কর্তৃপক্ষের আদেশের মাধ্যমে, ইত্যাদি।
প্রণয়ন পদ্ধতি কাকে বলে: সাধারণ সর্বভৌম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আইন তৈরি করাকে আইন প্রণয়ন বলে। অথবা সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত অধনস্থ অন্য কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আইন তৈরি করাকে আইন প্রণয়ন বলে।
ডায়াস ও হিউগস এর মতে, নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত পদ্ধতিতে যে আইন প্রণয়ন করে থাকে আইন প্রণয়ন বলে।
আবার দেশের সংবিধান যদি লিখিত হয় তাহলে বলা যায়, সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ অথবা উক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত অধনস্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আইন তৈরি করাকে আইন প্রণয়ন বলে।
১.৫। আইন প্রণয়ন পদ্ধতিকে আরো কার্যকর করার জন্য তোমার পরামর্শ দাও। / আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে আরো কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক করার ক্ষেত্রে তোমার প্রস্তাব ও পরামর্শ দাও।
আইন-প্রণয়ন পদ্ধতিটি কার্যকর করার লক্ষ্যে নিম্নোক্ত পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে:
১) সংসদ সদস্যদের সু-শিক্ষিত হওয়া: সংকোচ সদস্যরা হলেন জনগণের প্রতিনিধি তারা জনগণের জন্য আইন প্রণয়ন করেন। তারা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হলে এই পদ্ধতি আরো কার্যকর হবে।
২) আইন বিষয়ে শিক্ষা লাভ: যেহেতু সংসদ সদস্যগণ আইন প্রণয়ন করেন সেহেতু তাদেরকে আইন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করা জরুরী। বিশেষ করে আইনের ন্যূনতম জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তাহলে এই পদ্ধতি আরো কার্যকর হবে।
৩) অধিক পরিমাণ বেসরকারি বিল গ্রহণ করা: অধিক পরিমাণ বেসরকারি বিল গ্রহণ করলে এই পদ্ধতি আরো কার্যকর হবে।
৪) স্বাধীনতা: আইন প্রণয়ন পদ্ধতি আরও কার্যকর করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন হতে হবে।
৫) ৭০ অনুচ্ছেদ শিথিল: বাংলাদেশে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদ আরও শিথিল করতে হবে।
৬) গণভোট: কোন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তা অধিক কার্যকর করার জন্য গণভোটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাহলে ওই আইন সম্পর্কে জনগণের অভিমত জানা যাবে।
৭) দায় দায়িত্ববোধ: আইন প্রণয়ন পদ্ধতি আরো কার্যকর করতে হলে সংসদ সদস্যদের ট্রান্সপারেন্সি ও লাইবেলিটি থাকতে হবে।
৮) জনগণের কল্যাণকে প্রাধান্য: আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে দলীয় সুবিধার না দেখে জনগণের কল্যাণে প্রাধান্য দিতে হবে। তাহলে এই পদ্ধতি আরো কার্যকর হবে।
উপসংহার: কোন আইন প্রণয়ন করা হলে তার সকল জনগণের উপর বাধ্যকর হয়। এর মধ্যে দেশের সকল জনগণের অধিকার ও কর্তব্য জড়িত থাকে। কাজী আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী।
১.৬। অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সাংবিধান কি সংশোধন করা যায়? ব্যাখ্যা কর।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতায় শর্ত আরোপ করা হয়েছে। উক্ত শব্দ অনুযায়ী অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংবিধানের কোন বিধান পরিবর্তন করা যাবে না।
আবার সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের কোন বিধান বর্ণিত হয়নি।
সুতরাং বলা যায় অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা যায় না।
তবে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক আদেশ-জারীর মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে।
যেমন - প্রথম সংশোধনীতে (১৯৭৫ সালে) রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, রাষ্ট্রপতির শূন্য পদ পুরোন, রাষ্ট্রপতির শপথ সংক্রান্ত বিধানের সংশোধন আনা হয়।
দ্বিতীয় সংশোধনীতে: রাষ্ট্রপতি কোন কারণে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে তার উত্তরাধিকার মনোনয়ন সংক্রান্ত বিধান সংশোধন আনা হয়।
১৯৭৮ সালের সংশোধনীতে মূলনীতির পরিবর্তন করা হয়।
পরিশেষে বলা যায় অন্ত দেশ জ্ঞানের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা না যেন বিভিন্ন নজির অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অন্তরের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করতে পারেন। তবে এটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতির পরিপন্থী।
১.৭। একটি বিল কি কি পর্যায়ে অতিক্রম করে জাতীয় সংসদের আইনে পরিণত হয়? বিশ্লেষণ কর। / একটি বিল কিভাবে আইনে পরিণত হয়?
আইনের খসড়া প্রস্তাবটি বিল বলা হয়। এই খসড়া প্রস্তাব বা বিল আইনে পরিণত হতে হলে কয়েকটি পর্যায়ে বা ধাপ অতিক্রম করতে হয়। নিম্নেতে আলোচনা করা হলো।
১) সংবিধানের ৮০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে প্রত্যেকটি প্রস্তাব দিল আকারে উত্থাপিত হতে হবে।
২) বেসরকারি সদস্য অর্থাৎ সাধারণ সদস্যদের কেউ বিল উত্থাপন করতে চাইলে সংসদ সচিবের নিকট ১৫ দিনের নোটিশ প্রদান করতে হয় এবং নোটিশের সাথে বিলের প্রতিলিপি প্রদান করতে হয়। আর সরকারি সদস্য অর্থাৎ মন্ত্রীদের কেউ বিল উত্থাপন করতে চাইলে সাত দিনের নোটিশ প্রদান করতে হয় এবং নোটিশের প্রতিলিপি বিলের সাথে প্রদান করতে হয়।
৩) সরকারি বিলের ক্ষেত্রে স্পিকার চাইলে সাত দিনের সময় আরো কমিয়ে আনতে পারেন। নোটিশের সময় শেষ হলে সংসদের কার্য দিবসের কার্য অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত সদস্য অর্থাৎ যে মন্ত্রী বা যে সদস্য বিলটি উত্থাপন করতে চান তিনি বিলটি উত্থাপনের অনুমতির জন্য সংসদে প্রস্তাব পেশ করেন। সংসদ অনুমতি দিলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলটির শিরোনাম সকলকে পড়ে শোনান।
৪) কেউ যদি প্রস্তাবের বিরোধিতা না করেন তাহলে সংসদ অনুমতি দিয়েছেন বলে ধরা হবে। আর কেউ বিরোধিতা করলেই স্পিকার সেটি ভোটাভুটিতে দিবেন। যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলে সংসদ অনুমতি দিয়েছেন বলে ধরা হবে। এ সময় বিলের উপর কোন আলোচনা হয় না। সরকার বিলটি গ্যাজেটের প্রকাশ করে সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করেন।
৫) বিল্টির উপর সাধারণ আলোচনার জন্য একটি দিন ধার্য করা হয়। উক্ত দিনে ভারপ্রাপ্ত সদস্য বিলটি বিবেচনার জন্য অর্থাৎ বিতর্ক ও আলোচনার জন্য সংসদ কর্তৃক গ্রহণ করার প্রস্রাব করেন। প্রস্তাবের ভাষা বিভিন্ন রকমের হতে পারে। যেমন
ক) বিলটি বিবেচিত হোউক
খ) স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ করা হোউক
গ) জন্ম যাচাইয়ের জন্য প্রচার করা হোউক
ঘ) বাছাই কমিটিতে প্রেরণ করা হোক
ঙ) অবিলম্বে সংসদে বিবেচনার জন্য গ্রহণ করা হোক ইত্যাদি।
কোন সদস্য বিরোধিতা না করলে বিলটি আলোচনার জন্য গ্রহণ করা হয় আর কেউই বিরোধিতা করলে ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়।
এ পর্যায়ে সংসদ দুটি কাজ করতে পারে:
১) বিলটি সরাসরি আলোচনার জন্য গ্রহণ করতে পারে:
নির্দিষ্ট একটি দিন ধার্য করা হবে। উক্ত দিনে বিলটি বিস্তারিত আলোচনা হবে। বিভিন্ন দফা উপ দফা র উপর সংশোধনী আসতে পারে অর্থাৎ বিলের বিভিন্ন অংশে পরিবর্তিত হতে পারে। বিস্তারিত আলোচনার পর প্রত্যেক দফার উপর ভোটগ্রহণ করা হয়।
২) কোন কমিটিতে পাঠানোর পক্ষে অনুমোদন দিতে পারে:
সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের ভোটে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিলটি যদি কোন কমিটিতে পাঠানো হয় তাহলে তিনটি পর্যায়ে অতিক্রম করতে হয়।
ক) কমিটি পর্যায়: কমিটিতে বিলটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা হয়। কমিটির বিলের নীতি উদ্দেশ্য পরিবর্তন বা কোন অংশ সংযোজন করতে পারে না তবে কোন অংশ সংশোধনের প্রস্তাব করতে পারে।
খ) রিপোর্ট পর্যায়: কমিটির চেয়ারম্যান রিপোর্টটি সংসদে পেশ করেন। সেটি গেজেট আকারে প্রকাশ করার পর ভারপ্রাপ্ত সদস্য প্রস্তাব করেন যে, বিলটি বিচার বিবেচনার জন্য গ্রহীত হোক। সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমোদন পেলে তা আলোচনার জন্য গৃহীত হয়।
গ) সংসদে আলোচনার পর্যায়: মৃত বিলটি সংসদের আলোচনার জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন ধার্য করে সেদিন বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিভিন্ন দফা ও দফার উপর সংশোধনী প্রস্তাবনা হয়। ্
পর্যায় অতিবাহিত হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত সদস্য বিলটিকে সামগ্রিকভাবে গ্রহণের প্রস্তাব করেন। এই সময় আর কোন আলোচনা হয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পেলেই বিলটি সামগ্রিকভাবে গৃহীত বা পাস হয় আর সমর্থন না পেলে বাতিল হয়ে যায়। বিউটি পাস হলে স্পিকার তার সত্যায়িত করেন।
রাষ্ট্রপতি সম্মতি: সংসদ কর্তৃক গৃহীত বিল সম্মতির জন্য রাষ্ট্রপতি নিকট পেশ করতে হবে। রাষ্ট্রপতির দুটি অপশন:
১); হয়তো তিনি ১৫ দিনের মধ্যে উক্ত বিলে সম্মতি প্রদান করবেন। যদি তিনি পুরনো দিনের মধ্যে উক্ত বিলে সম্মতি প্রদান করেন তাহলে সাথে সাথে বিলটি আইনে পরিণত হয়।
আর যদি ১৫ দিনের মধ্যে সম্মতি নাও দেন এবং ফেরত না পাঠান তাহলে ১৫ দিন অতিবাহিত হলেও উক্ত বিলটি ৩০ সম্মতি দিয়েছেন বলে ধরে নেয়া হবে।
২) ১৫ দিনের মধ্যে বিলটি পুনঃবিবেদনার জন্য সুপারিশ সহ সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন। যদি ১৫ দিনের মধ্যে পুনঃ বিবেচনার জন্য সুপারিশসহ ফেরত পাঠান তাহলে সংসদে আবার বিল উত্থাপিত হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের ভোটে বিলটি গৃহীত হলে পুনরায় বিলটি সম্মতির জন্য রাষ্ট্রপতি নিকট পেশ করা হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি একটি অপশন আছে।
উক্ত অপশন হল- সাত দিনের মধ্যে উক্ত বিলের সম্মতি প্রদান করবেন। যদি তিনি এতে অপরাগ বা অসামর্থ্য হন তবে সাত দিন অতিবাহিত হলে বিলটি তিনি সম্মতি দিয়েছেন বলে ধরে নেয়া হবে।
উপসংহার: বাংলাদেশের পার্লামেন্ট বা জাতীয় সংসদ একটি সার্বভৌম আইন প্রণয়নকারী সংস্থা। প্রথমে কোন প্রস্তাবিত বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়। অতঃপর যদি উক্ত বিল সংসদে গৃহীত হয় এবং রাষ্ট্রপতি তাদের সম্মতি প্রদান করেন তাহলে উক্ত বিল আইন রূপে লাভ করে।
১.৮। কখন একটি অধ্যাদেশ বা বিল আইনে পরিণত হয়? / রাষ্ট্রপতি ঘোষিত কোন অধ্যাদেশ বিল আইনে পরিণত হয়?
রাষ্ট্রপতি ঘোষিত কোন অধ্যাদেশ নিম্নোক্ত ভাবে আইনে পরিণত হয়:
১) অন্ত দেশ জারির পর তা যদি বাতিল করা না হয় তাহলে পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকে উপস্থাপিত হবে।
২) ৩০ দিনের মধ্যে উক্ত অধ্যাদেশ পাস হতে হবে।
৩) ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে উক্ত অধ্যাদেশের কার্যকারিতা থাকবে না।
৪) যেই অধ্যাদেশ গুলো সরকার আইনে পরিণত করতে চায় সেগুলো প্রত্যেকটির ব্যাপারে বিলের নোটিশ প্রদান করতে হবে। উক্ত নোটিশের ভিত্তিতে আইন ও সংসদ বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করবেন।
৫) ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীর উত্থাপিত বিল সাধারণ বিলের ন্যায় আলোচনা হতে পারে আবার আলোচনা ছাড়াও আইনে পরিণত হতে পারে।
উপসংহার: বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি হলেও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতীত তিনি তেমন কোন কাজ করতে পারেন না। শুধুমাত্র দুটি কাজ তিনি এককভাবে করতে পারেন। আর তা হল প্রধানমন্ত্রী ও বিচারপতি নিয়োগ।
১.৯। বাংলাদেশ সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি গুলো কি? / বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা প্রকৃতি ও পরিধি নির্ণয় কর। / জাতীয় সংসদ কি সংবিধান সংশোধন করার একক ক্ষমতার অধিকারী?
আইন পরিবর্তনশীল একটি বিষয়। বাংলাদেশের আইনের অন্যতম উৎস হলো বাংলাদেশের সংবিধান। যদিও বাংলাদেশ সংবিধান সুপরিবর্তনীয় নয় তবুও এই সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন করা যায়। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক আইনের ও পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কারণ আর যে আইনের প্রয়োজন আছে পরবর্তীতে সেই আইন অন্যভাবে প্রয়োজন হতে পারে। এক সময় কোন আইনের প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে সংশোধনের পদ্ধতি লিপিবদ্ধ হয়েছে। নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো:
বাংলাদেশ সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন করতে হলে মূলত দুটি শর্ত পূরণ করতে হয়:
১) সংশোধনের জন্য আনিত বিলের শিরোনাময় এই দুই সংশোধনের কোন কোন বিধান সংশোধন করতে হবে তাই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়।
২) জাতীয় সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার কমপক্ষে দুই তৃতীয়াংশ সদস্যদের ভোটে সেই সংশোধনী প্রস্তাব গৃহীত হবে।
উপরোক্ত ভাবে কোন বিল গৃহীত হলে সম্মতি দানের জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট উপস্থাপন করতে হয়। রাষ্ট্রপতি সাত দিনের মধ্যে উক্ত বিলে সম্মতি দান করবেন । রাষ্ট্রপতি যদি সাত দিনের মধ্যে উক্ত পেলের সম্মতিধানে ব্যর্থ হন তাহলে তিনি সম্মতি দান করছেন বলে গণ্য হবে।
পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের অনেকগুলি বিধান সংশোধনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। যেমন সংবিধানের প্রস্তাবনা, জরুরী বিধান, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, মৌলিক অধিকার ইত্যাদি।
১.১০। সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানের মূল বৈশিষ্ট্য কি পরিবর্তন করা যায়? উপযুক্ত কেস লর উল্লেখপূর্বক আলোচনা কর।/ সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের মূল বৈশিষ্ট্য কি পরিবর্তন করা যায়? / সংবিধানের মৌলিক কাঠামো কি সংশোধনযোগ্য?
আইন পরিবর্তনশীল একটি বিষয়। বাংলাদেশের আইনের অন্যতম উৎস হলো বাংলাদেশের সংবিধান। যদিও বাংলাদেশ সংবিধান সুপরিবর্তনীয় নয় তবুও এই সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন করা যায়। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক আইনের ও পরিবর্তন প্রয়োজন হয়ে পড়ে । কারণ আজ যে আইন প্রয়োজন আছে পরবর্তীতে সেই আইন অন্যভাবে প্রয়োজন হতে পারে। এক সময় কোন কোন আইনের প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। তবে সংবিধানের সকল বিধান পরিবর্তন করা যায় না।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আইন ২০১১ এর ৭ খ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তন করা যায় না। যদিও অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মূল বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট উক্ত সংশোধনী আইন কে ক্ষমতা বহির্ভূত বলের রায় প্রদান করেন। সুপ্রিম কোর্টের রায় ছিলো নিম্নরূপ:
১) সংসদ তার সংশোধনী ক্ষমতা বলে সংবিধানের মূল বৈশিষ্ট্যকে সংশোধন করতে পারে না কারণ মূল বৈশিষ্ট্য সংশোধনের বা পরিবর্তন করলে সংবিধান তার মৌলিকত্ব হারাবে।
২) বিচার বিভাগের চূড়ান্ত ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের উপর ব্যস্ত থাকে। অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে হাইকোর্টের একাধিক স্থায়ী ব্যাঞ্চ তৈরি করে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়। এটি অসংবিধানিক।
সুতরাং বলা যায় বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধনযোগ্য নয় বা মূল বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা যায় না । ( আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ মামলা)
১.১১। আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ মামলায় কিভাবে বিচারিক পর্যালোচনা প্রয়োগ করা হয়েছিল?
( আনোয়ার হোসেন বনাম বাংলাদেশ মামলা) নিচের লাইন উপরের লাইন এর সাথে যুক্ত হবে।
আবার একটি সংবিধানের দিকনির্দেশনা হিসেবে যেই প্রস্তাবনার কাজ করে সেই প্রস্তাবনা কেউ অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সংশোধন করা হয়। সংবিধান ব্যাখ্যার জন্য প্রস্তাবনাই মূল ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ সংবিধানের কোন অংশ বা শব্দ বা বাক্যের অর্থ স্পষ্ট মনে হলে প্রস্তাবনার সাহায্যে সেই অংশের অর্থ স্পষ্ট করা যায় । প্রস্তাবনাকে ঘিরেই সংবিধান আবর্তিত হয়। আর সংবিধান জাতির দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। প্রস্তাবনা কে সংবিধানের আইনগত ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। এছাড়া পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রস্তাবনায় সংশোধন আনা হয়েছিল। ১০ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট উত্তর সংশোধন বাতিল করেন।
১.১২। সাংবিধানিক প্রাধান্য বলতে কি বুঝ?/ সংসদীয় প্রাধান্য ও সাংবিধানিক প্রাধান্য বলতে কি বুঝ?/ জাতীয় সংসদ কি এককভাবে সংবিধান সংশোধন করতে পারে? / সংসদীয় প্রাধান্য এর উপর সাংবিধানিক প্রাধান্য স্থান পায়।
বাংলাদেশের সংবিধান একটি লিখিত সংবিধান। আর লিখিত সংবিধান সুপরিবর্তনীয় হয় না। বাংলাদেশ সংবিধান পরিবর্তন করতে হলে বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়।
১) প্রথমত: সংশোধনের জন্য আনীত বিলের শিরোনামায় যে বিধান সংশোধন করা হবে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
২) জাতীয় সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যার কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যদের ভোটে সেই সংশোধনী প্রস্তাব গৃহীত হতে হয়।
জাতীয় সংসদে গৃহীত বিল অনুমোদন করতে রাষ্ট্রপতি অনেকটা বাধ্য থাকেন। বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ সংবিধানের বিধানবলি সাপেক্ষে আইন প্রণয়ন ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। অর্থাৎ দেখা যায় জাতীয় সংসদ এককভাবে সংবিধান সংশোধন করতে পারে।
কিন্তু বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের প্রণীত আইনকে বাধ্যতা দানের জন্য সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট সংসদ প্রণীত আইন বাতিল করতে পারে। যেমন সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের পঞ্চম সপ্তম অষ্টম সংশোধনী বাতিল করেছেন। সুতরাং বলা যায় জাতীয় সংসদ এককভাবে সংবিধান সংশোধন করতে পারে কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট উক্ত সংশোধনী বাতিল করতে পারে।
No comments:
Post a Comment